এটি কোনও প্রথাগত সাক্ষাৎকার নয় ।। ভাষান্তর : আনিকা শাহ ও ইমরান ফিরদাউস

[মার্কেজ আর কুরোসাওয়া। দুই অসীম দিগন্তের দিকপাল। অক্টোবর, ১৯৯০ এ দেখা হয়েছিলো তাদের। আকিরা তখন তার শেষ ফিল্ম বানাচ্ছেন। বোগোতায় মার্কেজ কিছু সময় ফিল্ম-সমালোচকের কাজ করেছিলেন, অনেক আগে। মানে তখনো লেখা হয় নাই,ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স্ অভ সলিট্যুড আর লাভ ইন দ্যটাইম অভ কলেরা। তো যাই হোক, ১৯৯০ এ তাদের দেখা হলো। ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নানান বিষয় নিয়ে কথা বলেন দুই জনে মিলে। সে সাক্ষাতে। সেই কথোপকথন বাংলা করলেন, দুই অসাধারণ লেখক আনিকা শাহ ও ইমরান ফিরদাউস। লাল জীপ, অনুবাদকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, পাঠককে স্বাগতম জানাতে চায়। আসুন তাহলে…]

e0a6aee0a6bee0a6b0e0a78de0a695e0a787e0a69c-e0a695e0a781e0a6b0e0a78be0a6b8e0a6bee0a693e0a6afe0a6bce0a6bee0a6b0

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: দুই বন্ধুর মধ্যে কথা হচ্ছে, আমি চাই না শুনতে খবরের কাগজের সাক্ষাৎকারের মতো লাগুক, কিন্তু আমার খুব কৌতূহল আপনার সম্পর্কে, আপনার কাজ সম্পর্কে। যেমন, আপনি স্ক্রিপ্ট কীভাবে লেখেন আমি জানতে চাই। এক তো এইজন্য যে আমি নিজে চিত্রনাট্য লিখি। আর দুই, আপনি বহু বিখ্যাত সাহিত্য থেকে প্রচুর অ্যাডাপ্টেশন করেছেন, আর আমার নিজের কাজ থেকে যে-যে অ্যাডাপ্টেশনই হয়েছে বা হতে পারে তার সবগুলা নিয়েই আমার সন্দেহ হয়।

আকিরা কুরোসাওয়া: যখনই আমার মাথায় আসা কোন ভাবনাকে চিত্রনাট্য বা স্ক্রিপ্টে নাজেল করবার বাসনা হয়ে থাকে, তখন আমি আমাকে কাগজ-পেন্সিল সমেত হোটেলের কোঠরে বন্দী করে ফেলি, বাসাবাড়ী ছেড়ে দিয়ে আর কি। ঐ মূহুর্তে আমার একটা সাধারণ ধারণা থাকে প্লট নিয়া এবং আমি এটাও কমবেশি জেনে ফেলি কিভাবে গল্পটা এগোবে বা সমাপ্তির দ্বারে পৌঁছুবে। যদি আমি না জানি কোন দৃশ্য দিয়া ঘটনার চাকা গড়াবে, সেক্ষেত্রে আমি স্বাভাবিকভাবেই চিন্তার যে প্রবাহ ন্যাচারেলি চাগাড় দিয়ে উঠে তার ধারায় চলতে থাকি।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: প্রথমে কোন্‌টা মাথায় আসে, আইডিয়া না ইমেজ?

আকিরা কুরোসাওয়া: আমি বিষয়টা খোলাসা করে বলতে পারি না, কিন্তু আমার মনে হয় ঘনঘটাটা আদতে শুরু হয় বিচ্ছিন্ন কিছু ইমেজের লুকোচুরির ভেতরে দিয়ে। বিপরীতভাবে, আমি জানি যে – জাপানে চিত্রনাট্যাকাররা পয়লা ধাপেই স্ক্রিপ্টের একটা সর্বাঙ্গীন ধারণা তৈয়ার কইরা ফেলে, দৃশ্যাবলী দিয়ে তারা বিষয়টা গুছায় ফেলে, এই চক্রান্তের মধ্যে প্লট সাধনের পর তারা মূল লেখালেখির পর্বে প্রবেশ করে।  কিন্তু, আমার মনে হয় এইটা স্ক্রিপ্ট করার রাইট ওয়ে নয়, যেহেতু আমরা ঈশ্বর নই।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: আপনি যখন শেক্সপিয়ার, গোর্কি অথবা দস্তয়ভস্কির লেখা পর্দায় তরজমা করেছেন তখনও কি পদ্ধতিটা এমন ছিল? ইনট্যুইশন বা নিজস্ব অনুভূতিমালার উপর ভরসা করা?

আকিরা কুরোসাওয়া: যেসব পরিচালক সিনেমা বানায়, প্রায় সময়ই আদ্দেক ছবি করার পরও বুঝে উঠতে পারেন না যে, সিনেম্যাটিক ইমেজের মধ্যে দিয়া লিটেরারি ইমেজের বার্তা দর্শকের চোখের পাতায় তুলে ধরার মত বেয়াড়া কাজ আর একটিও নেই।  এইটা অন-স্ক্রিন অ্যাডাপ্টেশনের শর্তও নয়।  মনে করেন, একটা ডিটেকটিভ উপন্যাসে বলা আছে লাশটা পাওয়া গেছে রেললাইনের ধারে, একজন নবীন পরিচালক চাইবে যে উপন্যাসের বর্ণনার মত করে পারফেক্ট একটা স্পট খুঁইজা বাইর করতে। আমি তখন তারে বলি, তুমি তো অন্যায় করতেছো! সমস্যাটা হইলো – তুমি তো উপন্যাসটা পইড়া ফেলছো, তাই তুমি জানো এবং কেবল জানো যে, লাশটা রেললাইনের ধারেই পড়ে ছিলো, থাকবে। পরন্তু, যে দর্শকজন উপন্যাসটা পড়ে নাই তার সমীপে রেল লাইন বা মাঠের আইল সবই এক কথা। বিষয়টা হলো – নবীন পরিচালকেরা লিটারেচার বা সাহিত্যের জাদুকরী ভালবাসার করতলে বন্দী হয়ে পড়ে, বাট তারা এইটা বিস্মৃত হয় যে, সিনেম্যাটিক ইমেজেমালার একটি পৃথক যাপনভঙ্গী ও প্রকাশরীতি আছে।  দ্যাট মাস্ট বি এক্সপ্রেসড ইন আ ডিফারেন্ট ওয়ে।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: বাস্তবের এমন কোনো দৃশ্য কি মনে পড়ে যেইটা মনে হয়েছে ফিল্মে প্রকাশ করা সম্ভব না?

e0a695e0a781e0a6b0e0a78be0a6b8e0a6bee0a693e0a6afe0a6bce0a6bee0a6b0

আকিরা কুরোসাওয়া: আলবৎ। ইলিদাচি নামক এক খনি শহরে আমি কাজ করতাম সহাকারী পরিচালকের ভূমিকায়, তখন আমি লাইনে নতুন। শহরটাকে প্রথম দেখাতেই পরিচালক মহাশয় এলান করলেন এখানকার পরিবেশ যেমন মহৎ তেমনই আজিব; আর তাই জন্যে আমরা এখানকার চিত্রধারণ করবো। কিন্তু ছবিতে আমরা যা তুললাম তা খুবই পরিচিত একটা দৃশ্য… যে কোনো কারখানাভিত্তিক শহরের। এর অতিরিক্ত যা আমরা জানি ছবিটা তা জাহির করতে পারলো না। যেমন ধরেন এলাকার কর্ম-পরিস্থিতি খুবই বিপদজনক এবং খনি এলাকার নারী ও শিশুদের জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে চিরস্থায়ী ডরের ভিতরে বাস করতে হয়- সেসব কথা উহ্য রয়ে গেলো। যখন কেউ এলাকাটির নিসর্গের পানে তাকায় তখন তার মনে কিন্তু সংশয় জাগে… স্পষ্টতঃ যেন মনোরমতার মাঝে অদ্ভুত কোন অসারতা বিরাজ করছে। আর এই বোধটাই ক্যামেরার চোখে চোখ রেখে সত্যি করে তোলা সম্ভব হয়নি।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: সত্যি বলতে আমার দেখা হাতেগোনা কয়েকজন ঔপন্যাসিক আছেন যাঁরা নিজেদের লেখা পর্দায় দেখে খুশি ছিলেন। আপনার অ্যাডাপ্টেশনগুলার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা কী?

আকিরা কুরোসাওয়া: আপনার অনুমতি নিয়ে তাহলে আমি একটি প্রশ্ন করি: আমার করা রেড বিয়ার্ড সিনেমাটি কি দেখেছেন?

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: আমি বিশ বছরে সিনেমাটা ছয়বার দেখেছি। যদ্দিন পর্যন্ত না আমার বাচ্চারা সিনেমাটা দেখতে পারে প্রায় প্রতিদিন তাদের সাথে ওইটা নিয়ে কথা বলেছি। আমার কাছে, আমার পরিবারের সবার কাছে ওইটা যে কেবল আপনার সিনেমাগুলার মধ্যে সবচাইতে প্রিয় তা না, পুরা সিনেমার ইতিহাসেই ওইটা আমার সবচেয়ে প্রিয়।

আকিরা কুরোসাওয়া: আমার জীবনচর্যার বিবর্তনের একটা প্রসঙ্গ-বিন্দু বলতে পারেন রেড বিয়ার্ড-কে। আমার সকল সিনেমার ক্ষেত্রে সত্য –  প্রত্যেকটাই প্রতিটির চাইতে আলাদা।  রেড বিয়ার্ড ছিল আমার একটা দশার শেষ ও অন্য দশা শুরুর ক্রান্তি বিন্দু।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: সেইটা বোঝা যায়। তাছাড়া ওই ফিল্মেরই দুইটা দৃশ্য আছে যেগুলা আপনার সমগ্র কাজের সাথে তুলনা করে দেখলে বেশ এক্সট্রিম, এবং দুইটাই ভুলতে না-পারার মতো – একটা দীর্ঘপদ পতঙ্গ বা প্রেয়িং ম্যান্‌টিসের দৃশ্যটা, আর আরেকটা হাসপাতাল প্রাঙ্গনের কারাটে ফাইট।

kurosawa-painting

আকিরা কুরোসাওয়া: বটে, তবে আমি আপনাকে যা বলতে চাইছি তা হইলো – উপন্যাসটির রচয়িতা শুগুরো ইয়ামামোতো তার উপন্যাসে চলচ্চিত্রিক পুনঃউপস্থাপনের ঘোর বিরোধী ছিলেন সর্বদা। তবে রেড বিয়ার্ডের ক্ষেত্রে তিনি ব্যতিক্রম নজির হাজির করলেন। কারণ, আমি নির্দয়ের মতো গোঁ ধরেছিলেম ছবিটা করবো বলে। তারপর হলো কী, সিনেমাটা দেখা শেষ করে, ঘাড় ঘুরিয়ে আমার পানে চেয়ে বললেন, ‘সিনেমাটা তো দেখছি গল্পের থেকেও সরস হয়েছে।’

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: ওনার সিনেমাটা এত ভালো কেন লাগল বলেন তো?

আকিরা কুরোসাওয়া: কারণ, সিনেমার অন্তর্নিহিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সমন্ধে তাঁর সম্যক ধারণা ছিল। একটি মাত্র পয়েন্টে তিনি আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, সেটা হলো প্রোটাগনিস্ট সম্পর্কে, যে কিনা একজন সম্পূর্ণ ব্যর্থ নারী, যাকে তিনি এভাবেই চিত্রকল্পে ভাস্বর করেছিলেন। কিন্তু অদ্ভুত জিনিস হলো, একটি ব্যর্থ মহিলার ধারণাটিই তার উপন্যাসে স্পষ্টরূপে ধরা ছিল না।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: ওনার কাছে হয়তো মনে হয়েছে যে ধরা ছিল। আমাদের ঔপন্যাসিকদের ক্ষেত্রে তো প্রায়ই অমন ঘটেই থাকে।

আকিরা কুরোসাওয়া: ব্যাপারটা তাই। প্রকৃতপক্ষে, অনেক লেখককেই বলতে দেখেছি: ‘উপন্যাসের ঐ অংশটা ভালোভাবে চিত্রিত হয়েছে।’ বস্তুত, তাঁরা যে বিষয়টার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন তা কিন্তু সাধিত হয়েছে নির্মাতার গুণে। আমি জানি তাঁরা আদতে কী বলতে চেয়েছেন, কারণ তাঁরা তাদের লিখিত শব্দগুলিকে পর্দায় সাবলীলভাবে উচ্চারিত হতে দেখছেন, শুদ্ধ। তবে, এই সাবলীলতা যে পরিচালকের ঋজু ইনট্যুইশন বা স্বজ্ঞার প্রয়োগের ফলাফল সে বিষয়টা আমল করতে পারেন না। উপলব্ধি করতে পারেন না যে, যা তিনি ছাপার হরফে স্পষ্ট করে তুলতে পারেননি, নির্মাতা তাই হাজির করেছেন ছায়ার কায়ায়।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: সে তো জানা কথাই: ‘পোয়েট্‌স্‌ আর মিক্সার্‌স্‌ অভ পয়েজন্‌স্‌’। কিন্তু আপনার এখনকার ফিল্মে ফেরত আসি – কোন্‌ বিষয়টা শুট করা সবচেয়ে কঠিন হবে, ঘূর্ণিঝড়?

আকিরা কুরোসাওয়া: মোটেই নহে। সবচেয়ে দুরূহ কাজ হইলো জানোয়ারদের সাথে ডিল করা। যেমন, জল-সাপ, গোলাপভূক পিপীলিকা। পোষা সাপ দিয়ে কাজ চলে না, এরা মানুষের লগে বেশি মাখোমাখো হয়া থাকে। তারা ইতরপ্রাণীর সহজাত বুদ্ধি বা জ্ঞানবশতঃ পালিয়ে যায় না, নামে সাপ হলেও আচরণগুলি যেন বানমাছের মতন। এখন কাজের প্রয়োজনে সমাধান হইলো একটা জংলী সাপ ধরা, যে তার সর্বস্ব দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেই যাবে জাল ছিঁড়ে পালানোর জন্য এবং তখন কিন্তু সত্যি সত্যি আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার যোগাড় হয়। সুতরাং, বলা যায় সাপ তার চরিত্র ভালোভাবেই রূপায়ণ করেছেন। আবার ধরো পিপলি বেগমদের কথা। মানে পিপীলিকা মশাইদের এক কাতারে গোলাপের কোন ডাল বেয়ে ফুল পর্যন্ত মার্চ করানোটা একটা কোটি টাকার প্রশ্ন। এরা এতই লুথা যে, ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে লাইনে উঠাইতে পারবেন না। তাদের এই অনভিলাষী চরিত্রের স্খলন হইলো তখনই, যখন আমরা ঐ ডালের অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত সমগ্রটুকুন মধু দিয়ে লেপে দিলাম। অতঃপর ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ্দ হাটিয়া চলিতে উদ্যত হয়। বাস্তবিক অর্থে, আমরা এন্তার প্রবলেম ফেইস করছি, তবে বিরক্ত হই নাই, সবগুলিকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছি, ভেবেছি। কারণ, এর মাধ্যমে আমি জীবন কে সামলানোর গুপ্তমন্ত্র জেনেছি।

kurosawa-painting-3

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: হুম্, বুঝতে পেরেছি। কিন্তু এটা কী ধরনের সিনেমা যাতে ঘূর্ণিঝড়ের সাথে সাথে পিঁপড়া নিয়েও ঝামেলা হয়? প্লটটা কী?

আকিরা কুরোসাওয়া: হুমম্‌… এটা কয়েকটি শব্দ দিয়ে সংক্ষেপে বলাটা খুব কঠিন।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: কেউ খুন করে কাউকে?

আকিরা কুরোসাওয়া: নট রিয়েলি। গল্পটা একজন মুরুব্বী নারীর যে কিনা নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমার আঘাত এড়িয়ে বেঁচে যাওয়া স্বল্প ক’জনের একজন এবং তার নাতী-নাতনীকুল, যারা তাকে দেখতে এসেছিলো গেল গ্রীষ্মে – তাদের ঘিরে সহজ একটা স্টোরি। আমি অতিশয় বেদনা উদ্রেককারী বাস্তবানুগ কোন দৃশ্য ধারণ করি নাই এইখানে, যা দেখে অদেখাজনেরা ভয়ে কুঁকড়ে যেতে পারে। একইভাবে, এইটা আরো যে কারণে করতে চাইনি – তাতে করে এই ঘটনার পরম ঘৃণা ও আতঙ্কের বাস্তবধর্মী চেহারাটা ফস্কে যাবার সম্ভাবনা থাকে। আমি দেখাইতে চাই যে এই অ্যাটম বোমার আঘাতে মানুষের মনের মানচিত্রে যে ধরনের ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে এবং সে মানুষই কী উপায়ে সেই ক্ষতচিহ্নসহ আরোগ্যের সাহস সঞ্চয় করেছে। বোমাবাজির সেই দিনটির কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে, এমনকি এখনও আমার বিশ্বাস হতে চায় না এই বাস্তব পৃথিবীতে এইরকম ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু, এই ঘটনার সবচেয়ে বাজে দিকটি হচ্ছে জাপানিরা ইতোমধ্যেই তাদের সাথে হওয়া এহেন হীন আচরণের কথা বিস্মৃতির অতলে চালান করে দিচ্ছে।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: এই ঐতিহাসিক স্মৃতিবিলোপের অর্থ কী জাপানের ভবিষ্যতের জন্য? বা, জাপানের মানুষের পরিচয়ের জন্য?

আকিরা কুরোসাওয়া: জাপানিরা এই বিষয়টা নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে চায় না। আমাদের নির্দিষ্ট কিছু রাজনীতিবিদ আমেরিকার ভয়ে মুখ কুলুপ এঁটে বইসা থাকে। তারা মনে হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের মুখের কথারেই আপ্তবাক্য বলে মানছেন। মানে উনি কইছেন যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিত করনের জন্য নাগাসাকিতে বোমা ফেলতে হইছে তাদের।  এটা একটা মহৎ কারণ।  এই কারণে বিশ্বযুদ্ধ হয়তো শেষ হইছে কিন্তু জাপানিদের যুদ্ধ কিন্তু তাতে খতম হয় নাই। সরকারী প্রজ্ঞাপন মোতাবেক হিরোশিমা, নাগাসাকিতে মৃতের সংখ্যা ২,৩০,০০০। যেখানে আসল সংখ্যাটা পাঁচ লাখেরও অধিক। যুদ্ধের পঁয়তাল্লিশ বছর পর আজও ২৭০০ জন ভিক্টিম ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন হাসপাতালের বিছানায়। তাদের অন্তর্বেদনার কোন সুরাহা হইছে কি? অন্যভাবে বলা যায়, অ্যাটম বোম্ব এখনও জাপানিদের হত্যা করে চলেছে।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: সবচাইতে যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুবসম্ভব এইটা হতে পারে যে ইউ. এস. তড়িঘড়ি করে বোমাটা ফেলেছিল এই ভয়ে যে সোভিয়েত তাদের আগে জাপান দখল করে ফেলবে।

আকিরা কুরোসাওয়া: মানলাম আপনার কথা… কিন্তু এমন একটা শহর উপর এই হীন আচরণ কেন? যে শহরে বেসামরিক লোক ছাড়া আর কিছুই নাই, তাদের সাথে যুদ্ধবাজদের কোন/কেন বিরোধ? আসলে যুদ্ধ চালিয়েছে যে সামরিক শক্তিকেন্দ্র তাদের গায়ে কেন ছুঁড়লো না!

e0a6aee0a6bee0a6b0e0a78de0a695e0a787e0a69c

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: এবং তারা ইম্পিরিয়াল প্যালেসেও বোমাটা ছোঁড়ে নাই।  টোকিওর বুকে নিশ্চয়ই সেইটা বেশ নাজুক একটা জায়গা ছিল। আমার মনে হয়, তারা রাজনৈতিক এবং সামরিক ক্ষমতা বজায় রেখে দ্রুত একটা সমঝোতায় যেতে চেয়েছিল, কিন্তু এমনভাবে যেন মিত্রদের সাথে লুটের মাল ভাগাভাগি না করতে হয়। মানবজাতির ইতিহাসে অন্য কোনো দেশকে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় নাই। তবে, জাপান যদি পারমাণবিক বোমা ছাড়াই আত্মসমর্পণ করত, সেইটা কি আজকের জাপান হত?

আকিরা কুরোসাওয়া: এটা বলা কঠিন। নাগাসাকির যে মানুষগুলো টিকে গেছেন, তাদের অধিকাংশ কোনভাবেই সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা মনে করতে চায় না। মৃত্যুর হাত এড়িয়ে বেঁচে থাকা/টিকে থাকার জন্য তাদের মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন সবাইকে পরিত্যাগ করতে হয়েছে। তারা এখনো নিজেদের দোষী মনে করা থেকে বিরত রাখতে পারে না। এর বাদে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী দেশটিকে নানান ছল-ছুঁতোয় দখল করে রাখে ছয় বছর, যা জাপানিদের স্মৃতিবিলোপের গতি ত্বরান্বিত করেছে বরং। জাপানের সরকার আবার এদের সাথেই কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। জানেন তো, আমি এই পুরো পরিস্থিতিকেই বুঝতে চাই যুদ্ধ দ্বারা উৎপন্ন অনিবার্য ট্র্যাজেডি হিসেবে। তারপরেও মনে হয় কি জানেন… যারা এই বর্বর আচরণটা করলো তাদের কি একবারও উচিত ছিল না জাপানিদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা? আর যতক্ষণ না এটি ঘটছে, ততক্ষণ এই নাটকের কোন পরিসমাপ্তি ঘটবে না।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: এতদূর? এরপর যে দীর্ঘ সুখের যুগ, তাই দিয়ে সেই দুর্ভাগ্যের ক্ষতি পূরণ হয় না?

আকিরা কুরোসাওয়া: পারমাণবিক বোমার লেজ ধরেই শুরু হইলো স্নায়ু যুদ্ধ এবং যুদ্ধাস্ত্র ব্যবসার ম্যারাথন। আরো পাওয়া গেলো পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ও ব্যবহারের বৈধ অজুহাত। এইসব সূত্রের মধ্যে দিয়ে সুখের উদ্ভব সম্ভব নয় এই চরাচরে।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: বোঝা গেল। পারমাণবিক শক্তির জন্মের উৎসটাই অভিশপ্ত, এবং অভিশাপ থেকে জন্মানো শক্তি – কুরোসাওয়ার জন্য লাগসই থিম। কিন্তু, আমার উদ্বেগের জায়গাটা হল, আপনি পারমাণবিক শক্তিকে দোষ দিচ্ছেন না, বরং প্রথম থেকেই তার যে অপব্যবহার হচ্ছে সেইটার দোষ দিচ্ছেন। ইলেক্ট্রিক চেয়ার থাকলেও, ইলেক্ট্রিসিটি জিনিসটা তো ভালো।

আকিরা কুরোসাওয়া: এটা একই জিনিস নয়। আমি মনে করি নিউক্লিয়ার এনার্জি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মানবজাতির সামগ্রিক শক্তি, বুদ্ধি, জ্ঞানের বাইরে।  নিউক্লিয়ার এনার্জির ব্যবস্থাপনায় ন্যানো ত্রুটি বা ভুলের তাৎক্ষণিক খেসারত কিন্তু অপরিমেয় এবং তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের ঝাল শত প্রজন্মব্যাপী ভোগ করেও শেষ হবার নয়। অপর দিকে, ফুটন্ত পানিকে আপনি ঠান্ডা হবার সুযোগ দেন, দেখবেন খানিক বাদেই পানির উত্তপ্ততা বা উত্তপ্ত পানি আপনার আর কোন বিপদের কারণ হিসেবে উঁকিঝুকি দিবে না। আসুন, আমরা সেসব বস্তুর ব্যবহার নিরোধ করি যেগুলো শত-সহস্র বছরেও নিজের উত্তাপ বিকিরণে শীতল হতে জানে না।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: মানবতার উপর যে এখনও আমার বিশ্বাস টিকে আছে, তার একটা বড় কারণ কুরোসাওয়ার সিনেমা। কিন্তু এইক্ষেত্রে আমি আপনার অবস্থানটাও বুঝতে পারি – সিভিলিয়ানদের উপর পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের ভয়াবহ অন্যায় নিয়ে, জাপানকে ব্যাপারটা ভুলায়ে দিতে আমেরিকান আর জাপানিদের যৌথ ষড়যন্ত্র নিয়ে। কিন্তু আবার পারমাণবিক শক্তিকে চিরতরে অভিশপ্ত বানায়ে দেয়াটাও আমার কাছে অন্যায্য মনে হয়। এইটাও তো বিবেচনা না করলে না যে পারমাণবিক শক্তি বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব, মানবতার খাতিরেই। কেমন যেন দোটানা হয় ভাবলে, এবং সেইটা এই অস্বস্তি থেকেই যে জাপান ভুলে গেছে, এবং যারা দোষী, যুক্তরাষ্ট্র, তারা শেষতক দোষ স্বীকার করে নাই, জাপানের প্রাপ্য ক্ষমাপ্রার্থনাটাও দেয় নাই।

kurosawa-painting-2

আকিরা কুরোসাওয়া: মানবজাতি আরো মানবিক হয়ে উঠবে তখনই… যখন তারা আমল করতে শিখবে যে – বাস্তবতার সব ফাঁক-ফোকড়কে স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হয় না। আমি মনে করি না – আমাদের অধিকার আছে গুহ্যদ্বারবিহীন সন্তান অথবা আট পা-ওয়ালা ঘোড়া উৎপাদনের, যেমনটা ঘটেছে রাশিয়ার চেরনোবিলে।  যাহোক, এখন মনে হইতেছে আলাপটা খুবই সিরিয়াস দিকে গিয়া উঠতেছে… আমার উদ্দেশ্য কিন্তু তা কখনোই ছিলো না।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: আমরা ঠিক কাজটাই করেছি। একটা বিষয় এতটা গুরুত্বপূর্ণ হলে সেইটা গুরুত্বের সাথে আলোচনা না করে পারা যায় না। এখন যেই ফিল্মটার কাজ শেষ হচ্ছে, সেইটায় কি এই বিষয়ে আপনার চিন্তাভাবনাগুলা প্রকাশ পাচ্ছে?

আকিরা কুরোসাওয়া: সরাসরি অর্থে নয়। যখন অ্যাটম বোমা ফেলা হয়, তখন আমি তরুণ সাংবাদিক; এবং আমি চাইছিলাম ঐদিন আসলে কি ঘটেছিলো সেসব নিয়ে লিখতে, কিন্তু মার্কিন দখলদারি উঠে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এসব নিয়ে কথা বলা/লিখা করা একদম নিষিদ্ধ ছিল। এখন, এই সিনেমা বানাতে গিয়ে আমি গবেষণা শুরু করি , বিষয়টা অধ্যয়ন করি এবং আগের সময়ের চেয়ে এই ঘটনা নিয়ে এখনকার জানাশোনা বেশ পোক্ত হয়েছে। তবে, হিরোশিমা-নাগাসাকি ইস্যুতে, আমি যদি আমার মনের কথাবলী, দ্যোতনামালা, অভিব্যক্তিনিচয় সরাসরি পর্দায় প্রক্ষেপ করি, তাহলে যা দাঁড়াবে তা বোধহয় শুধু জাপান কেন, পৃথিবীর কোন দেশেই দেখানো সম্ভব হবে না!

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: এই আলোচনার প্রতিলিপি প্রকাশ করা নিয়ে আপনার কী মত?

আকিরা কুরোসাওয়া: আমার কোন আপত্তি নাই। এইটা এমন একটা ব্যাপার যেইটা নিয়ে বরং কোনরূপ বাধা-নিষেধ ছাড়াই পৃথিবীর সকল মানুষের মন্তব্য-মতামত-প্রতিক্রিয়া প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: অনেক ধন্যবাদ। সবকিছু ভেবেচিন্তে, আমার মনে হয় আমি জ্যাপানি হলে আপনার মতনই একরোখা হতাম এই প্রসঙ্গে। আর যত যাই-ই হোক, আমি বুঝতে পারি আপনাকে। কোনো যুদ্ধই কারো জন্য ভালো না।

আকিরা কুরোসাওয়া: যেন তাই হয়। যখন ছিটকে আসা উল্কাপিণ্ড তো বটেই এমন কি যিশু এবং ফেরেশতারাও সেনাপ্রধান তথা সামরিক নেতার মত আচরণ শুরু করে যুদ্ধের নামে ভজঘট শুরু হয় তখনই।

dreams

 

২৫ জুন ২০১৫

পাবলিশ্‌ড্‌ অ্যাট লাল জীপের ডায়েরী

Advertisements

ওয়ান্স: স্ট্রিট সং অথবা আরবান মিজ-অঁ-সিনের গীতমালা

[ সিনেমা নিজেই যেমন একটা পাঠকৃতি বা টেক্সট; তেমনি এর থাকে ইনার ও আউটার টেক্সট বা এক কথায় বিবিধ সাব-টেক্সট। অর্থাৎ, কোন জমিনের উপর সিনেমার গল্প হামাগুড়ি দিয়ে দাঁড়াইতেছে প্লাস সেই দাঁড়ানো সত্ত্বা দর্শকের লগে কি আলাপ জুইড়া বসতেছে- সেইটাও একটা আমল করার বিষয়। এদিকে, সিনেমার ভিতরেই আবার থাকে নানান বিষয়বস্তুর ইন্ট্রা-টেক্সচুয়াল রিলেশন… যেমন- স্ক্রিপ্ট, পারফর্মার, সম্পাদনা, আর্ট ডিরেকশন, ক্যামেরার চলন, সঙ্গীত ইত্যাদি। তো, এতসব ইত্যাদির মধ্যে একটা বিষয় সিনেমার মধ্যে থাইকাও ইমেজময় হাজির থাকে নিজস্ব যোশে। সেইটা হইলো মিউজিক বা সিনেমায় ব্যবহৃত সঙ্গীতমালা বা আবহসুরের কথন। আমরা দেখেই থাকবো, (মিউজিক্যাল) ফিল্মের মিউজিক এমন একটা বিষয় যেইটা উপভোগের তরে সর্বদা সিনেমার গল্প জানতে হয় না; সিনেমার মূল আখ্যানের মার্জিনের ভিতরে বা বাইরে অবস্থান করে এইটা হয়ে উঠতে পারে নিজেই একটা পুরাণ। তথাপি, আমরা জানবো যে… বঙ্গদেশে পপুলার কালচারাল জার্নালিজম বা ক্রিটিক্যাল অধিবিচারের পরিকাঠামোতে সিনেমার সুরযোজনার বিষয়টি খুব একটা আলাপের কাপে জায়গা না পাইতে। তো, এহেন সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ভিতর মাথা গুঁজ কইরা থাইকা লালজীপের ডায়েরী সচেষ্টা করে, আপাত মন্দনশীল বোধিচর্চার থিয়েটারে অন্যতর আলাপের পরিসর অংকন করতে। সেই আকাঙ্ক্ষা থেইকা একটা সিনেমার গল্প না বলে বরং অই সিনেমার অন্যতম অ্যাপার্টাসের স্পিরিটের ধ্রুবতারারে ফলো কইরা একটা মিথোজীবীমূলক বয়ান হাজির করার কোশেশ করা হইলো আনিকা শাহের সদালাপী ভাষ্যের মধ্যে দিয়ে। আপনার যাত্রা ফূর্তির হোক! ] …ভূমিকাঃ ইমরান ফিরদাউস

once

সাইড-এ

ওয়ান্স শুরু যখন হয়, দেখা যায় এক ছেলে ডাবলিনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে গিটার বাজিয়ে গান গাচ্ছে। ভ্যান মরিসনের গান কভার করছে – অ্যান্ড দ্য হিলিং হ্যাজ বিগান। গিটারের ব্যাগটা সামনে রাখা, তাতে পথচারীদের দেয়া পয়সা। এক লোক এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শোনে, ছেলেটার প্রশংসা করে, তারপর জুতার ফিতা বাঁধার ছলে গিটারের ব্যাগটা নিয়ে দৌড় দেয়। ছেলেটাও পিছে পিছে যায়। খুব বেশিদূর যেতে হয় না, ছেলেটা শেষপর্যন্ত তার পয়সা ফেরত পায়, লোকটা অনেকটা আপোসেই দিয়ে দেয়। ছেলেটাও আর খুব একটা কথা বাড়ায় না। দু’জনেই বুঝতে পারে, তাদের মধ্যে পার্থক্য আসলে খুব বেশি নাই।

ওয়ান্স মিউজিকাল মুভি। ২০০৭ সালের। ডিরেক্টর জন কার্নি, মূল দুই চরিত্রে গ্লেন হ্যান্সার্ড আর মার্কেটা ইর্গ্লোভা। আমার ওয়ান্স-এর গান নিয়ে লেখার কথা, মুভি নিয়ে না। কিন্তু এই গানগুলার নিজস্ব একটা কনটেক্সট আছে, একটা ভিজ্যুয়াল আছে; সেগুলা নাকচ করে দেয়া সম্ভব না, সমীচীনও না বোধহয়। তাছাড়া, যতই পর্দার রিয়্যালিটিতে ঘটা ঘটনা হোক, পর্দার বাইরের রিয়্যালিটিতেও তো এমনটা ঘটে। সবকিছুই ঘটে।

ওয়ান্স-এ ছেলেটা বাস্কার, রাস্তায় গিটার বাজিয়ে গান গায়, তাতে যে যা পয়সা দেয়। স্ট্রিট পারফর্ম্যান্সের আরেক নাম বাস্কিং – পাবলিক প্লেসে পারফর্ম করা, দর্শক-শ্রোতাদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বিনিময়ে। উইকিপিডিয়া বলে বাস্কিংয়ের চল মধ্যযুগ থেকে। রোমানি জিপসিরা ঘুরতে ঘুরতে স্পেন হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বাস্কিং শব্দটা ইংল্যান্ড আর ইউরোপের বাকি অংশে নিয়ে আসে। ১৯৬০’র হিপ্পি কালচারের সাথেও বাস্কিং সম্পৃক্ত। বাস্কিং এখন বিভিন্ন দেশে প্রচলিত, বিভিন্ন নামে। বাস্কিংয়ে পারফর্ম্যান্সও বিভিন্ন ধরনের হয় – মিউজিক, অ্যাক্রোব্যাটিক্‌স্‌, স্কেচিং বা পেইন্টিং, ম্যাজিক ট্রিক কিংবা স্ট্রিট থিয়েটার। ২০০০ থেকে সাইবার বাস্কিংয়েরও প্রচলন শুরু হয়েছে, আর্টিস্টরা তাদের কাজ আপলোড করে দেয়, কারো ভালো লাগলে তারা পেপ্যালে কিছু ডোনেশন দেয়। পপুলার কালচারেও বাস্কিং বহুল ব্যবহৃত, আগেও ছিল, ইদানীং হয়তো গুরুত্বটা অন্যরকম, অন্তত ওয়ান্স-এ তো বটেই।

সাইড-বি

তো… ওয়ান্স-এ ছেলেটা বাস্কার। দিনের বেলা সে চেনাজানা গান কভার করে, রাত বাড়লে পর নিজের গান গায়। এরকম এক রাতে মেয়েটার সাথে তার দেখা হয় – সে ম্যাগাজিন বিক্রি করছিল, গান শুনে দাঁড়ায়, জিজ্ঞেস করে গানটা তার নিজের লেখা কিনা। ছেলেটার বাবার দোকান আছে, হুভার (ভ্যাক্যুম ক্লিনার) রিপেয়ার করার, ছেলেটাও কাজ করে সেখানে। মেয়েটার একটা নষ্ট হুভার থাকে। পরদিন তাদের আবার দেখা হয়, নষ্ট হুভার-সমেত (কজমিক কানেকশান কখনও কখনও ভ্যাক্যুম ক্লিনারের রূপেও আসে)। মেয়েটাও মিউজিশিয়ান, একটা মিউজিক স্টোরে সে পিয়ানো বাজায়, মালিকের অনুমতিসাপেক্ষে। তারা সেই স্টোরে যায়, মেয়েটা পিয়ানো বাজায়, ছেলেটা গিটার বাজায়, গান গায়, স্টোরের মালিকের সাথে সাথে আমরাও ফলিং স্লোলি শুনি।

once-movie-of-the-week

তোমার-আমার এই যে দেয়াল…

একজন মিউজিশিয়ানের সংকটগুলা আসলে কী কী? ডাবলিনের রাস্তায় দিনের বেলা ছেলেটা নিজের গান গায় না, অচেনা গানে পয়সা বেশি আসে না বলে। ‘তো, তুমি পয়সার জন্যই করো খালি?’ – এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সে থমকে যায় একটু, সে আদৌ হয়তো উত্তরটা জানে না, বা ভাবে নাই কখনও। কিন্তু ভেবে দেখলে, তার সামনে প্ল্যাটফর্ম বলতে আসলে কী আছে? মেয়েটা চেক রিপাবলিক থেকে আয়ারল্যান্ডে এসেছে, সাথে তার মা আর মেয়ে। সে কখনও ফুল, ম্যাগাজিন বিক্রি করে, কখনও মানুষের ঘরদোর পরিষ্কার করে। সে গান লেখে, সুর করে, পিয়ানো বাজায়, কিন্তু নিজের একটা পিয়ানো কেনার সামর্থ্য তার নাই। ছেলেটা নিজের গানের ডেমো রেকর্ড করে লন্ডনে যেতে চায়, কিন্তু পয়সা আসবে কোত্থেকে? বাস্কিং করে? হুভার রিপেয়ার করে? ওদের গান রাস্তাঘাট আর মিউজিক স্টোর থেকে স্টুডিওতে ঠিক কীভাবে পৌঁছাবে?

ওয়ান্স-এ আমরা ছেলেটা আর মেয়েটাকে কোলাবরেট করতে দেখি। আমরা একটা একটা করে গান শুনতে পাই। ওয়ান্স-এর গানগুলার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ বোধহয় লিরিক। সিম্পল অ্যান্ড কোজি – আমরা ঘরের বর্ণনা দিতে গেলে বলি এমন, তবে অনেকটা ওইরকম, এবং তারচেয়েও বেশি। আর্টিস্টদের ব্যক্তিগত টানাপোড়েন, একধরনের স্টোরিটেলিং – আমরা রিলেট করতে পারি, আমাদের নিজস্ব স্মৃতি গানের সাথে যুক্ত হতে থাকে, আমাদের নিজস্ব স্টোরির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হয়ে যায়। আমরা মুভির কনটেক্সটের সাথেও নিজেদের মিলাতে পারি। যা কিছু চাই আর যা কিছু পাওয়া সম্ভব, তার কনফ্লিক্ট তো আমাদের কাছেও নতুন না। একদিকে ব্যক্তিগত টানাপোড়েন, আরেকদিকে আর্থ-সামাজিক সংকট, এরমধ্যে প্রায়োরিটিটা কীভাবে ঠিক রাখা যায়? সিদ্ধান্তটা আমরা কীভাবে নিব? আমরা সামনে আগাতে চাই ঠিক আছে, কিন্তু সেজন্য যেটুকু ধাক্কা পিছন থেকে প্রয়োজন, সেটা কে দিবে? মাঝে মাঝে তো সেটুকুই সবচাইতে প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। ওয়ান্স-এর ছেলেটা আর মেয়েটা সেই দিক দিয়ে ভাগ্যবান – দুইজন মিউজিশিয়ান একে-অপরকে সাহায্য করছে, কোলাবরেট করছে, ছোটখাটো ব্যাপার না সেইটা। নাহলে, যেখানে দেখে মনে হচ্ছে যে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড চাচ্ছে একটা ঘটনা ঘটুক, কিন্তু ম্যাটেরিয়াল পৃথিবী বাগড়া দিচ্ছে, সেখানে এই প্যাটার্ন থেকে বের হওয়া যায় কী করে?

আশা-প্রত্যাশা-নিরাশার ত্রিকোণমিতি

ওয়ান্স-এর ছেলেটা আর মেয়েটা গ্লেন হ্যান্সার্ড আর মার্কেটা ইর্গ্লোভা। দুইজনই মিউজিশিয়ান, একসাথে পারফর্মও করত দ্য সোয়েল সিজন নামে। ডিরেক্টর জন কার্নি একসময় হ্যান্সার্ডের ব্যান্ড দ্য ফ্রেইম্‌স্‌-এর বেইজিস্ট ছিল। এবং হ্যান্সার্ড একটা সময় আসলেই বাস্কিং করত, বাস্কিং নিয়ে মুভির কিছু কাহিনিও হ্যান্সার্ডের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। ওয়ান্স-এর গানগুলা হ্যান্সার্ড আর ইর্গ্লোভার কম্পোজ আর পারফর্ম করা, একটা গানের পারফর্মার ট্রান্সফেরেন্স নামে একটা ব্যান্ড। ওয়ান্স-এ আমরা ২০০৭ সালের ডাবলিন দেখি, ওয়ান্স-এর গান-সূত্রে আমাদের আয়ারল্যান্ডের কন্টেম্পোর‌্যারি মিউজিক নিয়ে একটা বোঝাপড়া হয়। আমরা বাস্কিং নিয়ে ভাবি, গান কীভাবে রাস্তাঘাট থেকে স্টুডিওতে যায় সেইটা দেখি। আমরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া দেখি, বদলাতে-থাকা অর্থনৈতিক অবস্থায় ঠিকঠাকমতন বেঁচেবর্তে থাকার চেষ্টা দেখি, ইচ্ছা আর সামর্থ্যের গরমিল দেখি, অতীত-ভবিষ্যতের মাঝামাঝি বর্তমানে দাঁড়িয়ে ‘একবার কী হল…’ সেইটা দেখি। আমরা আমাদের দেখি। ছেলেটা আর মেয়েটার তো কোনো নাম ছিল না। ছেলেটা আর মেয়েটা তো আমরাও হতে পারি, বা হইও।

আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গিটার বাজিয়ে গান হয়তো গাই না, কিন্তু গান আমাদের মাথায় বাজে। আমাদের জীবন নির্বিবাদ যাপিত হতে থাকে বা থাকে না, আমরা একবারের অপেক্ষায় থাকি। আমরা “বিগ ব্রেইক”-এর চিন্তা করি। আমরা সংকেত খুঁজি, আমরা কজমিক কানেকশন নিয়ে ভাবি। আমরা মনস্থির করি সামনে আগাতে, আমরা ইতস্তত করি পিছনের ভাঙা মেরামত হয় নাই বলে। আমরা রাতদুপুর করে অফিস থেকে বাসায় ফিরে সকালে উঠে লেখার কথা ভাবি। আমাদের দিন খারাপ যায়, কিন্তু আমরা রাস্তায় অচেনা লোকেদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলি। আমরা ধরে রাখি, ছেড়ে দেই। আমরা স্রোতে ভেসে যেতে যেতে ভাবি কোথায় গিয়ে পৌঁছাব। আমরা অনেকদিনের ব্যবহারে ফাটল-ধরা গিটার বদলাই না। আমরা অনেক বেঠিকের মাঝে একটা কিছু ঠিক হওয়ার অপেক্ষা করি। একবার।

once

গান তুমি হও বিশ্রী গরম ভুলিয়ে দেয়া বৃষ্টি

গান তো একই সাথে সামষ্টিক, ব্যক্তিগতও। সামষ্টিক-ব্যক্তিগত বলতে কি কিছু আছে? হিউম্যন নেইচার-মতন? যেমন, একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমাদের সবার ঠিক একই রকম অনুভূতি হবে? ভঙ্গি আলাদা হবে নিশ্চয়ই, প্রকাশ আলাদা হবে, কিন্তু মূল বিষয়টা, এসেন্সটা একই? ওয়ান্স-এর গান শুনলে আমার ওইরকম মনে হয়। নাহলে, আয়ারল্যান্ডের দুইজন স্ট্রাগ্‌লিং আর্টিস্টের কাহিনিতে আমাদের আসবে-যাবে কেন? শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা তাহলে গান লেখা বা গান রেকর্ড করা নিয়ে না; গানের মধ্য দিয়ে একটা গল্প, একটা ছবি দেখিয়ে দেয়া নিয়ে। গানের মধ্য দিয়ে যোগাযোগ করা নিয়ে। এজন্যই হয়তো আসে-যায়, আর গানগুলা শুনলে মনে হয় ঠিক সময়ে এরকম ঠিক-ঠিক গানগুলা ওরা ক্যামনে গেয়ে ফেলল।

১৯ জুলাই ২০১৪

 

*ওয়ান্স-এর সাউন্ডট্র্যাক- Once OST

*বাস্কিং বিষয়ে আরও- Street Performance

**কৃতজ্ঞতা- ইমরান ফিরদাউস; ফর দ্য টাইটেল(স্‌), অ্যান্ড মোর

 

পাবলিশ্‌ড্‌ অ্যাট লাল জীপের ডায়েরী