অর্ণব এবং “অন্যরকম” বিষয়ক বোঝাপড়া

অর্ণবের গান নিয়ে লিখতে বসা আমার জন্য ঝক্কির হিসাবে প্রমাণিত হল মূলত এই কারণে যে অর্ণবের গান আমার ভালো লাগে। এবং কেন ভালো লাগে ঐটা নিয়ে আমি খুব বেশি ভাবি নাই। আড্ডায় অর্ণব-প্রসঙ্গ উঠালে পর যা-যা জানা গেল তা-তা মোটামুটি তাঁর গানের কথা, সুর, গায়কী, গলার স্বর, গানে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, গানের বিষয়বস্তু এবং আবহ থেকে শুরু করে তাঁর চেহারা এবং ব্যক্তিত্ব পর্যন্ত মোটাদাগে কভার করে। অর্ণবের গানের লিরিক অন্যরকম, রোজকার যা-ঘটে তা নিয়েই লেখা, কিন্তু অন্যভাবে। গানের কথার সাথে রিলেট করা যায়। গানের সুর, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ভ্যারিড, ফিউজ্‌ড্‌, এক্সপেরিমেন্টাল। অর্ণবের গলা, গায়কী একজন বলল সুদিং লাগে। আরেকজনের মতে অর্ণবের সমগ্র ব্যক্তিত্বটাও একটা কারণ তাঁর গানকে ইন্ট্রেস্টিং লাগার। আমার এক বন্ধু সেন্টিমেন্টাল হয়ে বলল ধর্, তুই এইখানে বসে যা ভাবতেছিস, যা বলতে চাইতেছিস, সেইটা অর্ণবের গানের মধ্যে আছে। তবে যে-বিষয়টা (বলা ভালো কীওয়ার্ডটা) প্রায় সবার কথায় কমন পাওয়া গেল, তা হল অর্ণব “অন্যরকম”। তো, এই অন্যরকমটা আসলে কীরকম? এবং কার তুলনায়? সবকিছুই তো নিজ-নিজমতো করে অন্যরকম, বা, সেভাবে বলতে গেলে কিছুই অন্যরকম না, আদতে। সেক্ষেত্রে আমরা এই অন্যরকমকে থিওরাইজ করি কী করে? এবং সেটা অবশ্যকরণীয়, কেননা, আপাতদৃষ্টে, কেবল অভিজ্ঞতা (তা সে যতই সুখকর হোক না কেন) একটা পর্যায়ের পর আমাদের কাছে আর যথেষ্ট না । আমরা অন্যকিছুর খোঁজে আছি, এবং সমূহ সম্ভাবনা আছে (বা বলা ভালো এমনই তো হয়ে থাকে) যে একটার ভিতর আরেকটা বর্তমান।

অর্ণবের শুরু থেকে এখনকার ইতিহাস সম্পর্কে আমি সচেতনভাবে ওয়াকিবহাল না। একটা সময় তাঁর গানের সাথে পরিচয় হয়, এবং ভালোলাগাবশত পরিচয় প্রলম্বিত হতে থাকে। তবে একটা হিস্টোরিক্যল ওভারভিউ এক্ষেত্রে অন্যরকম-বোঝাপড়ায় সহায়তা করতে পারে।

আমরা জানি অর্ণব শান্তিনিকেতন এবং বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করেছেন, ফাইন আর্টসে। বাংলা ব্যান্ডের সাথে পারফর্ম করা শুরু করেন প্রথমে কলকাতায়, পরে এখানে, খুবসম্ভব ’৯০ দশকের শেষদিক থেকে, বিভিন্ন লাইনআপ-এ। নাটক, টিভিসি ইত্যাদির মিউজিকও করতে থাকেন। আরও পরে সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন (মনপুরা, আহা!, জাগো, দীপ নেভার আগে, কলকাতা কলিং)। তাঁর এখন পর্যন্ত প্রকাশিত স্টুডিও অ্যালবামগুলা যথাক্রমে চাইনা ভাবিস (২০০৫), হোক কলরব (২০০৬), ডুব (২০০৮), রোদ বলেছে হবে (২০১০), আধেক ঘুমে (২০১২)। লাইভ অ্যালবাম অর্ণব অ্যান্ড ফ্রেন্ডস্‌ (২০০৯)। আমরা এ-ও জানি যে অর্ণব আর্টিস্ট, গান গান-লেখেন-সুর করেন, একাধিক বাদ্যযন্ত্র বাজান, সঙ্গীত আয়োজন/পরিচালনা করেন, রেকর্ড প্রডিউস করেন। সোলো আর্টিস্ট হিসাবে তিনি বোধহয় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েন অফ বিট নাটকে “সে যে বসে আছে”-‘র পর। আমার মনে পড়ে অর্ণবের এই গানটা আমার প্রথম শোনা (তবে আরও দেরিতে, নাটকবিহীন)। অর্ণবকে নিয়ে যে-সময়টায় এক ধরনের ক্রেইজ শুরু হল (আমার মতো অনেকেরই কল্যাণে), সেটা বোধহয় হোক কলরব-পরবর্তী সময়েই। তখন থেকেই অর্ণবকে অন্যরকম বলা চলমান। আমার এক বন্ধুর মতে, অর্ণবের গান প্রথম শোনার পর তার মনে হয় যে গানগুলা “মেইনস্ট্রিম” গানের মতো না। তাহলে, অন্যরকম কি এই-ই রকম, যা অদূর অতীতে ঘটে নাই, বা ঘটলেও চোখে পড়ে নাই, বা, প্রেফারেবলি, যা-কিছু ঘটেছে তার বিপরীত? তাহলে এই দাঁড়াল যে অর্ণব তাঁর প্রিডেসেসার বা সমসাময়িকদের তুলনায় অন্যরকম। [এখন আমরা চাইলে এই বিষয়ে তর্ক করতে বা না-ও করতে পারি যে একটা পর্যায় পর্যন্ত অন্যরকম হওয়াটা অর্ণব অ্যাফোর্ড করতে পারতেন।]

কিন্তু এতদূর এসে প্রশ্ন দাঁড়ায়, অন্যরকম হলেও হতে পারে, কিন্তু নতুন রকম কি? গান নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা মূলত সুর-কথা-গাওয়ার ধাঁচ নিয়ে ভাবি। সেভাবে ভাবতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, বেশ অনেকবার, যে অর্ণবের গান না হলেও, গানভাবনা আসলে তাঁর রবীন্দ্রভাবনারই কন্টিনিউয়েশন। যেন একটা সেট – গায়ক এবং শ্রোতার – রিপ্লেস হয়ে আরেকটা সেট এসেছে; এবং একই চিন্তা, গানের মাধ্যমে একই চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়ে যাচ্ছে (লিটেরালি অবশ্যই না, সাইকোলজিক্যলি)। অর্ণবের রবীন্দ্রবিস্তার আমার তরফ থেকে প্রস্তাবনা আকারেই রয়ে যায় আমার রবীন্দ্রজ্ঞানস্বল্পতা এবং গানের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণে অপারগতার কারণে। কিন্তু আমার সন্দেহ নাকচ হয় না যে অর্ণবের গানে প্রকাশভঙ্গিতে নতুনত্ব থাকতেও পারে, কিন্তু প্রকাশবস্তুতে না। সেক্ষেত্রে অর্ণবের অন্যরকম অন্যরকম হতে পারে, কিন্ত নতুন রকম হয়তো না শেষপর্যন্ত।

তবে তারপরও, সন্দেহসমেতই, অর্ণবের “অন্যরকম” হওয়ায় আমাদের উপকার বই অপকার হয় নাই। অর্ণবের গানের মধ্য দিয়ে আমরা একটা গানের পিছনে অনেকের কোলাবরেশন আরেকটু পরিষ্কার দেখতে পেলাম। একজনের গানের লিরিক অনেকজনে মিলে লেখা, বা অনেকে মিলে একটা গান গেয়ে ফেলা, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দিয়ে যাওয়া – যেসমস্তকিছু পূর্বেও ঘটছিল, খালি খেয়ালে আসে নাই – আমরা খেয়াল করলাম। অর্ণবের মাধ্যমে আমাদের এমন অনেক মিউজিশিয়ানদের সাথে পরিচয় হল যাঁরা ক্ষেত্রবিশেষে অর্ণবের চাইতেও ইন্ট্রিগিং (সাহানা বাজপেয়ী, যেমন)। আমরা গানে বেশকিছু মজার ট্রিটমেন্ট দেখলাম: আলগোছে লেখা লিরিক, চেনা-অচেনার মাঝামাঝি সুর, ইস্টার্ন-ওয়েস্টার্ন-নতুন-পুরান মিক্সআপ, নানান রকমের ইন্সট্রুমেন্ট, নতুন নতুন আওয়াজ – কী একটা হুইসেল, একটা চিৎকার, হারমনি বা অর্থহীন শব্দ বা মোবাইলের ভাইব্রেশন (“দিকবিদিক”), গানে গথিক আবহ (“বেবাক বিবাগী”, “তুই কি জানিস না ২”)। আমরা একাধিক জঁরায় অর্ণবের কারিগরি দেখলাম, ইন্ডি-পপ-রক-ফোক-ফিউশন-রবীন্দ্রসঙ্গীত… শেষ যেই গানটা শুনলাম সেইটা ইলেক্ট্রনিক ছিল। এবং আরও লাভ হল আমাদের। রবীন্দ্রসঙ্গীতের শ্রোতা বাড়ল, রবীন্দ্রবাদে অন্যসঙ্গীত (বা তাও না)এর শ্রোতাও বাড়ল। গানের মধ্যে অনেককিছু ইনকর্পোরেট করার স্কোপ আমরা দেখতে পেলাম। মোটমাট আমরা খুব এক্সাইটেড হয়ে উঠলাম, গান নিয়ে। “অন্যরকম”-এর নতুন-নতুন উপায় নিত্য বের করে যেতে হয় তাই-ই থেকে যাওয়ার জন্য, এবং, অর্ণব সেটা সফলভাবেই করলেন।

e0a685e0a6b0e0a78de0a6a3e0a6ac-2

অর্ণবের গানের শ্রোতা আসলে কারা? কারা অর্ণবের গানের সাথে রিলেট করতে পারে? অর্ণব নিয়ে যাদের মতামত আমি জানতে চেয়েছিলাম, তাদের বয়সে ভ্যারিয়েশন ছিল বটে, কিন্তু ক্লাসে? আমাদের অভিজ্ঞতা তো আমাদের অর্থনীতিই নির্ধারণ করে দেয়। আমার প্রায়ই মনে হত, অর্ণবের গানের শ্রোতা আমরা; মধ্যবিত্ত (উচ্চ? উচ্চ-মধ্য? নিম্ন-মধ্য?), মডার্নিস্ট (পোস্টমডার্ন তো আবার হয়ে সারি নাই আমরা এখনও… এবং আবারও, রবীন্দ্রনাথের ছায়া পড়ে যায়), যারা বাক্স থেকে বের হয় এই কথা জেনে যে বাইরেও আরেকটা বাক্স। আমাদের যাবতীয় মেট্রোপলিটান মেলান্‌কলি ধারণ করে, অর্ণবের গান, দু’-একটা ছাড়া (“তাঁতী”, “আকাশ কালো”), আমাদের জন্য। কিন্তু, আবার, জগতের সবার গান গাওয়ার তো বাধ্যবাধকতা নাই অর্ণবের। বা, তিনি যা গান, তার বিদ্যমানতা বা গুরুত্বও তো তিনি যা গান নাই তার জন্য খারিজ হয়ে যায় না। আর বলাই বাহুল্য তিনি যা গান তা তো আমরাও ধারণ করে থাকি – নৈমিত্তিক রোমান্টিসিজম – তা সে রাবীন্দ্রিক হোক বা অর্ণবীয়। অর্ণবের গানে বিপ্লবের কথা নাই, কিন্তু তাতে তো যাদবপুরে “হোক কলরব”-এর স্লোগান হতে কোনো সমস্যা হয় নাই। তাহলে একটার ভিতরেই আরেকটা থাকে, নিজস্ব সময়েই বাহির হয় কেবল। এবং যাবতীয় আপাত-বৈপরীত্যও, একটার সাথে একটা, বা একটার ভিতরে একটা, থাকে, অর্ণবের গানের মতোই, ফিউজ্‌ড়্‌। আমরা কখন কোনটা খুঁজছি তার উপর। আর কোনোটা খোঁজাতেই সমস্যা নাই, যতক্ষণ একটা আরেকটাকে নাকচ না করে দিতে চায়।

 

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

পাবলিশ্‌ড্‌ অ্যাট লাল জীপের ডায়েরী

Advertisements