অ্যাংস্ট

গত চারদিন ধরে আমি ঘর থেকে বের হই না। ফোন ধরি না, কারো সাথে কথা বলি না পারতপক্ষে। আমার রুমমেটের ধারণা আমার ছ্যাঁকা খেয়ে এই অবস্থা, সে সবাইকে তাই বলছে। গত চারদিন ধরে আমি মূলত বসে থাকি। শুয়ে থাকি, যখন বসে থাকি না। ঘুমাই, কষ্ট করে তিনতলা থেকে নেমে হলের ক্যান্টিন থেকে খাবার খাই। বটতলায় যাই না বলে লোকজন অবাক হয়, রুমমেটের কাছে জিজ্ঞেস করে আমার কী হয়েছে, রুমে আসতে চায়। রুমমেট তাদের নিরস্ত করে, বলে আমাকে সময় দিতে নিজেকে সামলানোর। তারা সময় দেয়।

সবাই বলে এই ক্যাম্পাসে সময় থেমে থাকে। কিছু বদলায় না, সবকিছু স্থবির। দশ বছর আগে যেমন ছিল, এখনও তেমন। এই বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির সময় কর্তৃপক্ষরা বোধহয় ভেবেছিল একটা লাইসিয়াম বানাবে। শিক্ষার্থীরা থাকবে, পড়বে, বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হবে, জীবন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা হবে তাদের। তারা অনেককিছু করবে। কিন্তু অনেককিছু করবার জন্য যেসমস্ত অনুষঙ্গ প্রয়োজন, সেগুলা দিতে তারা ভুলে যায়। ফলে একদল শিক্ষার্থী থাকে, পড়ে, হয়তো, এবং ওইটুকুই। তারা ঘুরে বেড়ায়, বিচ্ছিন্ন। তবে জীবন সম্পর্কে তাদের ধারণা হয়। জীবন সম্পর্কে খুব গুরুত্বপূর্ণ, সম্ভবত একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সত্য তারা উপলব্ধি করে। কিন্তু সেই উপলব্ধির সঠিকতা নিয়ে তারা নিশ্চত হতে পারে না, কখনও কখনও চায়ও না।

আমার রুমমেট দর্শনের ছাত্র। তাদের এক্সিসটেন্‌শিয়ালিজম পড়ায়। সার্ত্রে। অ্যাংস্ট। আতঙ্ক, অস্থিরতা, শূন্যতা, অর্থহীনতা। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকানোর অনুভূতি – পড়ে যাই যদি? কিন্তু, নিজে থেকেই ঝাঁপ দেই যদি? কোনো এক অজ্ঞাত ঈশ্বর হুট করে তৈরি করে পৃথিবীতে ছেড়ে দিয়েছে, আবার হুট করে মরেও যেতে হবে, মাঝখানে বেঁচে থাকার জন্য কোনো অর্থ নাই। অর্থ চাইলে নিজেকে খুঁজে বের করে নিতে হবে। আমাকে জিজ্ঞেস করে তৈরি করে নাই, অথচ আমার সকল কাজের দায়ভার আমার। স্বাধীনতার দণ্ডে দণ্ডিত। কনডেম্‌ন্‌ড্‌ টু বি ফ্রি।

যখন আমি ঘাপটি মেরে রুমে বসে থাকি না তখন আমি প্রচুর সোশ্যালাইজ করি। আমার যে খুব ভালো লাগে তা না, কিন্তু করা হয়। আমার অসংখ্য বন্ধু, বা বন্ধুসম মানুষ। বিভিন্ন ধাঁচের। ডিপার্টমেন্টের বন্ধু, হলের বন্ধু, রোজকার দেখা-হওয়া বন্ধু। তারা কেউ রাজনীতি করে, কেউ মিউজিক করে, কেউ ফিল্মে আগ্রহী। কেউ কেউ তুমুল নিষ্ঠার সাথে প্রেম করে, দুই-একজন পড়ুয়া বন্ধু আছে, তারা ভালো ফলাফলের পিছনে শ্রম দেয়, অক্লান্ত। এবং তারা থাকে। তারা কেবল থাকে – একই সুরে, একই ছন্দে, থাকে। এবং সবাই জেনে না-জেনে অ্যাংস্টগ্রস্ত। ভিতরে ভিতরে সবাই বুঝতে পারে জীবনের মানে নাই, তারা মানে দেয়ার চেষ্টা করে। সময় এখানে আগায় না, সবার অফুরন্ত সুযোগ মেলে নিজেকে দরকারের চাইতেও বেশি বুঝে ফেলার, এবং বুঝতে পারার বিফলতাটুকুও ধরে ফেলার। এখানে সবাই সবাইকে চেনে। কেউ কাউকে চেনে না।

আমি আর কয়েকদিন পর নিশ্চয়ই রুম থেকে বের হব। দৈনন্দিন আড্ডায় যাব, কথা বলব সবার সাথে। আগের মতো। এই মাসে কোন্ প্রোগ্রাম অ্যারেঞ্জ করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করব। ওরা আমার বানোয়াট ছ্যাঁকা-কাহিনি নিয়ে খোঁচাবে, আমি হাসব। প্রসঙ্গ পরিবর্তন হবে। ওরা জানবে না, বা হয়তো জানবে, যে কারণটা অ্যাংস্ট। প্রায় সবার ক্ষেত্রেই, এখানে, কারণটা আ্যাংস্ট।

 

২১ মার্চ ২০১৪, ১২ এপ্রিল ২০১৪

Advertisements