চেস্টার বেনিংটন, লিংকিন পার্ক: এলিজি কিংবা ইউলোজি

CB1
চেস্টার বেনিংটন

তখন আমরা টিনএইজ অ্যাংস্ট জানি না, কিন্তু যাপন করি। আলাদা করে গান শোনার তখন মাত্র শুরু। ডে-শিফ্টের স্কুলে যাওয়ার আগে রেডি হইতে হইতে এমটিভি আর ভিএইচওয়ান। চ্যানেলগুলা অ্যাড-জর্জরিত হয়ে যাওয়ার আগের দশা, গানই শোনাইত তখন, গানই দ্যাখাইত। তখন প্রথম লিংকিন পার্ক চেনা। পয়লা ক্রলিং, তারপর ইন দি এন্ড। হাইব্রিড থিওরি খুবসম্ভব প্রথম কেনা পাঁচটা সিডির মধ্যে একটা। তখন আমরা অ্যালবাম কিনে গান শুনতাম, তখন আমাদের শোনার কান মাত্র তৈরি হইতেছে। আমাদের ডেইজ্‌ড্‌ অ্যান্ড কনফিউজ্‌ড্‌ টিনএইজের অস্বস্তিতে এলপির গান আমাদের স্বস্তি দিত। আমাদের ব্যক্তিত্ব তখনও গজায় নাই। খড়কুটার মতন ভাইসা যাওয়া অশান্তির জগতে এলপি তখন শান্তি, ভাষাহীন অভিযোগ-অনুযোগের জগতে ভাষা। নিজেকে অবাক করে দিয়ে লিংকিন পার্ক শুনতে শুনতে একদিন ঘুমায়ে গিয়ে ভাবছিলাম এই চিল্লাচিল্লির মধ্যে ঘুম কিভাবে আসে। তখনও জানি নাই যে কেওসের মধ্যেই নির্বাণ থাকে, তা সে স্বল্পক্ষণ থাকলেও।

এলপির আগে টিনএইজ অ্যাংস্টের সিনে বোধহয় ছিল অ্যাভ্রিল লাভিন, এভানেসেন্স। এলপির পর আস্তে-ধীরে আসল গ্রিন ডে, অডিওস্লেভ। ইনোসেন্স টু এক্সপিরিয়েন্স। এলপি অনেকটা কানেক্টিং পয়েন্ট ছিল, ট্রানজিশনের ঠিক মাঝখানে। এই পয়েন্টে আমাদের নিয়ে আসছিল চেস্টার। সেই চিৎকারটা চেস্টারেরই ছিল যেই চিৎকারটা আমাদের ভিতরেও ছিল, বাহিরে আমরা আনতে পারি নাই। ও, ওরা যা বলত তা আমরাও বলতে চাইছিলাম, ওরা বলার পর মিলাইতে পারছি। সারাগায়ে পিলপিল করে হাঁইটা বেড়ানো রাগ-ক্ষোভ-ভয়-গ্লানি-অসহায়ত্বের মাঝে আমাদের মগজের জন্য ঠাঁই ছিল ওদের গান। এই কেউ-কিছু-না-বোঝা, এমনকি নিজেও না, যে ক্যামন লাগে – ওরা বুঝত, ওরা বলত যে এমন লাগে। চেস্টারের চিৎকারটা, ভিতরে ভিতরে চেস্টারের সাথে দিতে থাকা আমাদের চিৎকারটা তবে একটা কালেক্টিভ চিৎকারই ছিল। এসবের সাথেই আমরা আবছা আবছা ধরতে পারতেছিলাম যে আমরা নিশ্চয়ই অত একাও না, আমরা নিশ্চয়ই অনেক।

হাইব্রিড থিওরির পর মিটিওরা, তারপর মিনিট্‌স্‌ টু মিডনাইট। এরপর থেকেই এলপি থেকে দূরত্বের শুরু। এরপর থেকেই হয়তো আমরা বড় হয়ে যাচ্ছিলাম, এলপিকে ছাড়ায়ে। কিংবা আমাদের মনে হচ্ছিল যে এলপি আর আগের মতো নাই, পাল্টায়ে যাচ্ছে। পরিবর্তনকে ভালো-খারাপ ছাড়ায়ে শুধু পরিবর্তন হিসাব হয়তো আমরা দেখি নাই তখনও। দূরত্ব আর নৈকট্যের জটিল ডায়নামিক্সটা আবার উপলব্ধি হইল চেস্টারের মৃত্যুতে। লিংকিন পার্ক যে কোর মেমোরির একটা অংশ হয়ে গেছিল, এত বছর পরও তাদের সুর-তাল-কথা যে মনে রয়ে গেছে, সেইটা টের পাই নাই। টের পাই নাই লিংকিন পার্ক তারচেয়েও বেশি গুরুত্ববহ, যতটুকু ভাবার কথা খেয়ালে আসে নাই।

গান আমাদের টাইম ট্র্যাভেল করায়। আমাদের টিনএইজ ফেরত আসল, এলপি ফেরত আসল, আর এইসবের মাঝে আবার, কানেক্টিং পয়েন্টে চেস্টার। চেস্টার বেনিংটন। যে কিনা সিংস লাইক অ্যান এইনঞ্জল, স্ক্রিম্‌স্‌ লাইক আ ডেভিল। যাঁর জন্য রেস্ট ইন পিস বলতে পারতে সপ্তাহ ঘুরায়ে যায়, শেষে রেস্ট ইন রক বলা যায় কোনোমতে। তাঁর জার্নি, ১৯৭৬ থেকে ২০১৭, কিংবা ১৯৯৯ থেকে ২০১৭। তাঁর ট্রমা, তাঁর ডিপ্রেশন। এসবের কিছু আমরা জানছি, কিছু আমরা জানি নাই। কিন্তু তাতে চেস্টারের সাথে আমাদের সম্পর্কের হেরফের হয় নাই। আমরা জানতাম যে যা কেউ জানে নাই, তা আমরা-আমরা জানি। চেস্টারকে নিয়ে, লিংকিন পার্ককে নিয়ে আমার এরকম গল্প আছে। সেইটা একটা গল্প। এরকম বহুজনের বহু গল্প আছে। আর সেই গল্পগুলা একতরফা না, দীর্ঘ সময়ের যোগাযোগে তৈরি হওয়া গল্প। আর শেষপর্যন্ত কিছুতেই কিছু এসে যায় না বললেও এসে আসলে যায়। অন্তত এইটুকুতে এসে যায়।

CB2
চেস্টার বেনিংটন (মার্চ ২০, ১৯৭৬ – জুলাই ২০, ২০১৭)
Advertisements

নাউ প্লেয়িং: প্রোটোজে

13906732_10153970323433935_378653834121776590_n
প্রোটোজে

প্রোটোজে। জ্যমেইকান সিংগার, সংরাইটার।মিউজিক জঁরা রেগে, ডাব, রক। স্টুডিও অ্যালবাম দ্য সেভেন ইয়ার ইচ্ [The Seven Year Itch] (২০১১), দ্য এইট ইয়ার আফেয়ার [The 8 Year Affair] (২০১৩), এনশিয়েন্ট ফিউচার [Ancient Future] (২০১৫), রয়ালটি ফ্রি [Royalty Free] (২০১৬)।

প্রোটোজে রেগে-র জেনারেশন নেক্সট-এর অংশ, “রেগে রিভাইভাল”-এর অংশ। যারা রেগে-কে রিইনভেন্ট করতে চায়, যারা রেগের সাথে যোগ করে অন্য কিছু, কিন্তু মূলটা ঠিকঠাক রাখে – সেইম “রিডিম”, ডিফ্রেন্ট ট্রিটমেন্টস্।

প্রোটোজে স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড, যা-হচ্ছে-তাই বলে – ‘ফ্রম দ্য স্ট্রিট্‌স্‌ অভ জ্যমেইকা কামিং লাইভ অ্যান্ড ডিরেক্ট’। প্রোটোজে হালকা, খানিকটা মিসচিভাসও। কিন্তু তার জ্যমেইকান ইংলিশ বা জ্যমেইকান পাতোয়া আর আইয়ারিক-এ সে যা বলে অধিকাংশ সময়ই তা হালকা না। প্রোটোজে ভারি কথা হালকাচালে বলে ফেলে। এবং তাতে ভারি কথা ভারিই থাকে, চালটাই হালকা হয়।

রেগে-র রাস্টাফারাই রেফারেন্স প্রোটোজের গানে বার বার আসে। সেই রেড-গোল্ড-গ্রিন, ম্যারিহুয়ানা, জাহ্ আর আই অ্যান্ড আই। সেই ট্রিক্‌স্‌, হিপক্রিসি আর অপ্রেশনের ব্যাবিলন দেখা, বোঝা, আর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা; সেই জায়নের কথা ভাবা। অর্থাৎ কিনা নতুন প্রেক্ষাপটে ফান্ডামেন্টালি পুরান। এবং ফান্ডামেন্টালি পুরান তো থাকবেই; কেননা ফান্ডামেন্টালি নতুন কিছু তো ঘটতেছে না, আর পুরান নিয়েও নতুন নতুন হইতে পারে, বিপরীত যেহেতু না, মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ যেহেতু না।

উল্লেখ্য, প্রোটোজের সবগুলা অ্যালবামের গান শোনা যাবে ওর সাউন্ডক্লাউডে। আর র‌য়ালটি ফ্রি-র বি-সাইড ডাউনলোড করা যাবে ওর ওয়েবসাইট থেকে, [রয়ালটি] ফ্রি।

13707768_10153932611643935_5570512547759177428_n
প্রোটোজে

 

টপ টেন।

 

 

 

 

7yearitch-Protoje
অ্যালবাম কভার- The Seven Year Itch

 

 

 

CS2121649-02A-BIG
অ্যালবাম কভার- The 8 Year Affair

 

 

 

protoje-ancient-future-album-cover1
অ্যালবাম কভার- Ancient Future

 

 

 

Protoje-Royalty-Free-FREE-DOWNLOAD
অ্যালবাম কভার- Royalty Free

 

 

Protoje’s Soundcloud – https://soundcloud.com/protoje

& Website – http://www.protoje.com/

 

14009792_10210024994802512_925199113_n
প্রোটোজে

 

১৬ অগাস্ট ২০১৬

পাবলিশ্‌ড্‌ অ্যাট বাছবিচার

নাউ প্লেয়িং: লানা ডেল রেই

tumblr_inline_n1inrt8OJk1sprufq
লানা ডেল রেই

লানা ডেল রেই। আমেরিকান সিংগার, সংরাইটার, মডেল। মিউজিক জঁরা বারোক পপ, ড্রিম পপ, ইন্ডি পপ, রক, ট্রিপ হপ। স্টুডিও অ্যালবাম লানা ডেল রেই [Lana Del Rey] (২০১০), বর্ন টু ডাই [Born to Die] (২০১২), আল্ট্রাভায়োলেন্স [Ultraviolence] (২০১৪), হানিমুন [Honeymoon] (২০১৫)।

জ্যাজের সাথে ইলেক্ট্রো মিশলে যেইটা হয় ডেল রেই-এর গান সেইটা। কিন্তু ট্রিপি। কিন্তু সিনেম্যাটিক। ড্রিম যেইটা যেকোনো মুহূর্তে নাইটমেয়ার হয়ে যাইতে পারে। কতটুকু ইনডাল্‌জ্‌ করা নিরাপদ নিশ্চিত হওয়া যায় না। সিডাকটিভ টু দ্য পয়েন্ট অভ গথিক। হ্যাপি হইলেও স্যাড। স্যাড হইলেও স্যাড উইদ আ টুইস্ট।

ডেল রেইকে হিপস্টার জেনারেশনের নমুনা হিসাবে দেখা হইলেও ওর হিপস্টার-হালের পুরাটুক দুইহাজার অনওয়ার্ডসের না, বরং অর্ধেকটা। বাকি অর্ধেক ফর্টিজ-এর জ্যাজ এইজ আর ফিফটিজ-এর বিট জেনারেশন ইন্সপায়ার্ড। সেইটা মিউজিকে জ্যাজ-ইলেক্ট্রো মিক্সের ধরনে আর ঘন ঘন সেইসব সময়ের পপ কালচারের রেফারেন্সে আন্দাজ করা যায়। ডেল রেই তাদের অংশ যারা কাজের মধ্য দিয়ে আইডেন্টিটি তৈরি করে না, আইডেন্টিটি তৈরি করে আগে। যারা কনফিডেন্ট, কেয়ারফ্রি, এমনকি কেয়ারলেসও, কিন্তু একই সাথে ইনসিকিওর এবং ভালনারেবলও হইতে পারে। যারা বলে অল আই ওয়ানা ডু ইজ গেট হাই বাই দ্য বীচ। যারা ডেলিবারেটলি অধরা, কিন্তু এইটাও বোঝে যে লোকে তাদের ছবির বইয়ের মতো দেখবে, পড়বে না। যারা বলে যে আমার বয়ফ্রেন্ড কুল ঠিক আছে, কিন্তু আমার মতো কুল না, কিন্তু এইটাও ভাবে, যখন আমার আর বয়স কম থাকবে না, যখন আমি আর সুন্দর থাকব না, তখনও কি তুমি আমারে ভালোবাসবা? যারা আনডিফাইন্ড্ থাকতে গিয়ে কালেক্টিভলি ডিফাইন্ড্ হয়ে যায়, কিন্তু আবার দেখতে ডিফাইন্ড্ মনে হইলেও ডিফাইন করতে গেলে দেখা যায় যে ভেইগ।

del_rey_finals
লানা ডেল রেই

 

টপ এইট।

 

 

 

LDRAKALG
অ্যালবাম কভার- Lana Del Rey

 

 

Lana-Del-Rey-Born-To-Die-album-cover
অ্যালবাম কভার – Born To Die

 

 

Lana-Del-Rey-Ultraviolence-2014-1500x1500
অ্যালবাম কভার – Ultraviolence

 

 

 

LanaDelReyHoneymoon
অ্যালবাম কভার – Honeymoon

 

 

 

file
লানা ডেল রেই

 

০৩ জুলাই ২০১৬

পাবলিশ্‌ড্‌ অ্যাট বাছবিচার

নাউ প্লেয়িং: লিসা হ্যানিগান

file
লিসা হ্যানিগান

লিসা হ্যানিগান আইরিশ মিউজিশিয়ান, সিংগার-সংরাইটার। গান মূলত ইন্ডি ফোক জঁরার। অ্যালবাম এখন পর্যন্ত দুইটা – সী সো [Sea Sew] (২০০৮), প্যাসেঞ্জার [Passenger] (২০১১)।

হ্যানিগানকেও একই সাথে হার্শ এবং স্মুদ বলা যায়। ইন ফ্যাক্ট, দুইটার মাঝের লাইনটা প্রায় মিলায়ে যায় ওর গানে। হ্যানিগান এক্সাইটিং, ইনক্লুসিভ, ভ্যারিড – একটা স্টাইলের ভিতর অন্য অনেকগুলা স্টাইল।এবং হ্যানিগান গ্রোজ স্লোলি কিন্তু গ্রোজ স্ট্রং। রাইসের সাথে মিউজিক করায় বারবার তুলনা চলে আসে, কিন্তু তাদের একসাথে করা গানের তুলনায় আমার হ্যানিগানের গানই বেশি ভালো লাগে, যদিও একসময় উল্টাটা ঘটত। এইটা আমার পার্শিয়ালটি হইতে পারে, কিন্তু রাইস শোনার সময় আমার হ্যানিগানের কথা মনে আসলেও হ্যানিগান শোনার সময় আমি রাইসের কথা ভাবি না।

হ্যানিগানও মেলাংকলিক [আইরিশ ফোক ট্র্যাডিশন হয়তো], কিন্তু ওর মেলাংকলিটা মোর এভরিডে কাইন্ড অভ মেলাংকলি। মানে, হ্যাপি আর স্যাডের পার্থক্যটা ব্লার হয়ে যাইতে থাকে। আছে তো আছে টাইপ। ওর প্রেমটাও আছে তো আছে টাইপ – আলাদা করে প্রেমের এসে সেইভ করে যাইতে হয় না, সবাই নিজেরা নিজেরাই সেইভ্‌ড্‌ হয়ে যাইতে পারে, সম্ভব সেইটা, কমপ্যাশন থাকলেই হয়ে যায়।হ্যানিগান মেটাফরিক্যল। ওর গানে ওর যেই স্টোরিগুলা আছে, সেইগুলার সাথে রিলেট করার জন্য মেটাফোর ও নিজেই দিয়ে দেয় – পার্সোনাল স্টোরির জন্য পার্সোনাল মেটাফর থাকলে ভালো তাই, অন্য-নতুন স্টোরির জন্য অন্য-নতুন মেটাফর থাকলে ভালো তাই।

Hannigan_umbrella_by_James_Minchin_III1
লিসা হ্যানিগান

 

এইখানে টপ ফিফটিন পার্সোনাল ফেভারিট।

 

 

 

 

 

 

R-1774642-1323024736.jpeg
অ্যালবাম কভার – Sea Sew

 

 

 

 

 

 

 

1316841199_lisa-hannigan-passenger-2011
অ্যালবাম কভার – Passenger

 

 

 

 

 

hannigan-lisa-4fd7337f29d32

২১ মে ২০১৬

পাবলিশ্‌ড্‌ অ্যাট বাছবিচার

নাউ প্লেয়িং: ডেমিয়েন রাইস

Damien-Rice-bw
ডেমিয়েন রাইস

ডেমিয়েন রাইস আইরিশ মিউজিশিয়ান, সিংগার-সংরাইটার, রেকর্ড প্রডিউসার। গান মূলত ফোক, ইন্ডি রক, ফোক রক জঁরার। এখন পর্যন্ত অ্যালবাম তিনটা – ও [O] (২০০২), ৯ [9] (২০০৬), মাই ফেভারিট ফেইডেড ফ্যান্টাসি [My Favourite Faded Fantasy] (২০১৪)।

রাইসের গান একই সাথে হার্শ এবং স্মুদ। অস্থির হইলেও শান্ত, শান্ত হইলেও অস্থির। এক ধরনের স্যাডনেস আছে, মেলাংকলি আছে, আমি আইরিশ ফোক লালাবাইগুলার সাথে সেইটার মিল পাই। রাইসের সাথে প্রথমদিকে লিসা হ্যানিগান গান গাইত। প্রথমদিকে বলতে রাইসের প্রথম দুইটা অ্যালবামের কাজ চলাকালীন সময়ে হ্যানিগান ওর ব্যান্ডের অংশ ছিল, পরে আলাদা হয়ে যায়। হয়তো ওদের একসাথে করা মিউজিকই ভালো ছিল, ওদের হারমনি-সমেত। অন্তত রাইসের জন্য বটেই, হ্যানিগান একটা এজ দিত ওকে। হ্যানিগানের জন্য হয়তো আলাদা হয়ে যাওয়াটাই ভালো ছিল। তবে প্রসঙ্গ আসলেও, হ্যানিগান এখানে না, সিন্স শী ডিমান্ডস হার ওউন প্রোফাইল।

রাইসের গানে প্রেম একটা ডমিনেটিং থীম। কিন্তু এই প্রেম হয়তো রোম্যান্টিক প্রেমের চাইতে ব্রড [মানে, এমন না যে শুধু রোম্যান্টিক প্রেম হইলেও সমস্যা ছিল – সেইটাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণই, আমাদের অপ্রস্তুত-হয়ে-থাকা সত্ত্বেও]। একদিকে প্রেমকে রিয়ালিস্টিক্যলি দেখানোর চেষ্ট আছে – “রিয়াল” প্রেম, বা, দ্য “রিয়্যালিটি” অভ প্রেম; অন্যদিকে আইডিয়ালিস্টিক ভিউ-ও আছে – শেষপর্যন্ত প্রেমই আমাদের বাঁচায়ে দিবে, তুমি আমাকে বাঁচায়ে দিবা, বা, হয়তো আমিও তোমাকে।

Damien-Rice-5278
ডেমিয়েন রাইস

 

এইখানের এগারটা গান পার্সোনাল ফেভারিট।

 

 

 

 

Damien_Rice_O_album_cover
অ্যালবাম কবার – O

 

 

 

 

377ff009
অ্যালবাম কভার – 9

 

 

 

 

 

Damien-Rice-My-Favorite-Faded-Fantasy1
অ্যালবাম কভার – My Favourite Faded Fantasy

 

 

tumblr_inline_n1inrt8OJk1sprufq
লিসা হ্যানিগান আর ডেমিয়েন রাইস

 

২১ মে ২০১৬

পাবলিশ্‌ড্‌ অ্যাট বাছবিচার

 

অর্ণব এবং “অন্যরকম” বিষয়ক বোঝাপড়া

অর্ণবের গান নিয়ে লিখতে বসা আমার জন্য ঝক্কির হিসাবে প্রমাণিত হল মূলত এই কারণে যে অর্ণবের গান আমার ভালো লাগে। এবং কেন ভালো লাগে ঐটা নিয়ে আমি খুব বেশি ভাবি নাই। আড্ডায় অর্ণব-প্রসঙ্গ উঠালে পর যা-যা জানা গেল তা-তা মোটামুটি তাঁর গানের কথা, সুর, গায়কী, গলার স্বর, গানে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, গানের বিষয়বস্তু এবং আবহ থেকে শুরু করে তাঁর চেহারা এবং ব্যক্তিত্ব পর্যন্ত মোটাদাগে কভার করে। অর্ণবের গানের লিরিক অন্যরকম, রোজকার যা-ঘটে তা নিয়েই লেখা, কিন্তু অন্যভাবে। গানের কথার সাথে রিলেট করা যায়। গানের সুর, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ভ্যারিড, ফিউজ্‌ড্‌, এক্সপেরিমেন্টাল। অর্ণবের গলা, গায়কী একজন বলল সুদিং লাগে। আরেকজনের মতে অর্ণবের সমগ্র ব্যক্তিত্বটাও একটা কারণ তাঁর গানকে ইন্ট্রেস্টিং লাগার। আমার এক বন্ধু সেন্টিমেন্টাল হয়ে বলল ধর্, তুই এইখানে বসে যা ভাবতেছিস, যা বলতে চাইতেছিস, সেইটা অর্ণবের গানের মধ্যে আছে। তবে যে-বিষয়টা (বলা ভালো কীওয়ার্ডটা) প্রায় সবার কথায় কমন পাওয়া গেল, তা হল অর্ণব “অন্যরকম”। তো, এই অন্যরকমটা আসলে কীরকম? এবং কার তুলনায়? সবকিছুই তো নিজ-নিজমতো করে অন্যরকম, বা, সেভাবে বলতে গেলে কিছুই অন্যরকম না, আদতে। সেক্ষেত্রে আমরা এই অন্যরকমকে থিওরাইজ করি কী করে? এবং সেটা অবশ্যকরণীয়, কেননা, আপাতদৃষ্টে, কেবল অভিজ্ঞতা (তা সে যতই সুখকর হোক না কেন) একটা পর্যায়ের পর আমাদের কাছে আর যথেষ্ট না । আমরা অন্যকিছুর খোঁজে আছি, এবং সমূহ সম্ভাবনা আছে (বা বলা ভালো এমনই তো হয়ে থাকে) যে একটার ভিতর আরেকটা বর্তমান।

অর্ণবের শুরু থেকে এখনকার ইতিহাস সম্পর্কে আমি সচেতনভাবে ওয়াকিবহাল না। একটা সময় তাঁর গানের সাথে পরিচয় হয়, এবং ভালোলাগাবশত পরিচয় প্রলম্বিত হতে থাকে। তবে একটা হিস্টোরিক্যল ওভারভিউ এক্ষেত্রে অন্যরকম-বোঝাপড়ায় সহায়তা করতে পারে।

আমরা জানি অর্ণব শান্তিনিকেতন এবং বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করেছেন, ফাইন আর্টসে। বাংলা ব্যান্ডের সাথে পারফর্ম করা শুরু করেন প্রথমে কলকাতায়, পরে এখানে, খুবসম্ভব ’৯০ দশকের শেষদিক থেকে, বিভিন্ন লাইনআপ-এ। নাটক, টিভিসি ইত্যাদির মিউজিকও করতে থাকেন। আরও পরে সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন (মনপুরা, আহা!, জাগো, দীপ নেভার আগে, কলকাতা কলিং)। তাঁর এখন পর্যন্ত প্রকাশিত স্টুডিও অ্যালবামগুলা যথাক্রমে চাইনা ভাবিস (২০০৫), হোক কলরব (২০০৬), ডুব (২০০৮), রোদ বলেছে হবে (২০১০), আধেক ঘুমে (২০১২)। লাইভ অ্যালবাম অর্ণব অ্যান্ড ফ্রেন্ডস্‌ (২০০৯)। আমরা এ-ও জানি যে অর্ণব আর্টিস্ট, গান গান-লেখেন-সুর করেন, একাধিক বাদ্যযন্ত্র বাজান, সঙ্গীত আয়োজন/পরিচালনা করেন, রেকর্ড প্রডিউস করেন। সোলো আর্টিস্ট হিসাবে তিনি বোধহয় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েন অফ বিট নাটকে “সে যে বসে আছে”-‘র পর। আমার মনে পড়ে অর্ণবের এই গানটা আমার প্রথম শোনা (তবে আরও দেরিতে, নাটকবিহীন)। অর্ণবকে নিয়ে যে-সময়টায় এক ধরনের ক্রেইজ শুরু হল (আমার মতো অনেকেরই কল্যাণে), সেটা বোধহয় হোক কলরব-পরবর্তী সময়েই। তখন থেকেই অর্ণবকে অন্যরকম বলা চলমান। আমার এক বন্ধুর মতে, অর্ণবের গান প্রথম শোনার পর তার মনে হয় যে গানগুলা “মেইনস্ট্রিম” গানের মতো না। তাহলে, অন্যরকম কি এই-ই রকম, যা অদূর অতীতে ঘটে নাই, বা ঘটলেও চোখে পড়ে নাই, বা, প্রেফারেবলি, যা-কিছু ঘটেছে তার বিপরীত? তাহলে এই দাঁড়াল যে অর্ণব তাঁর প্রিডেসেসার বা সমসাময়িকদের তুলনায় অন্যরকম। [এখন আমরা চাইলে এই বিষয়ে তর্ক করতে বা না-ও করতে পারি যে একটা পর্যায় পর্যন্ত অন্যরকম হওয়াটা অর্ণব অ্যাফোর্ড করতে পারতেন।]

কিন্তু এতদূর এসে প্রশ্ন দাঁড়ায়, অন্যরকম হলেও হতে পারে, কিন্তু নতুন রকম কি? গান নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা মূলত সুর-কথা-গাওয়ার ধাঁচ নিয়ে ভাবি। সেভাবে ভাবতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, বেশ অনেকবার, যে অর্ণবের গান না হলেও, গানভাবনা আসলে তাঁর রবীন্দ্রভাবনারই কন্টিনিউয়েশন। যেন একটা সেট – গায়ক এবং শ্রোতার – রিপ্লেস হয়ে আরেকটা সেট এসেছে; এবং একই চিন্তা, গানের মাধ্যমে একই চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়ে যাচ্ছে (লিটেরালি অবশ্যই না, সাইকোলজিক্যলি)। অর্ণবের রবীন্দ্রবিস্তার আমার তরফ থেকে প্রস্তাবনা আকারেই রয়ে যায় আমার রবীন্দ্রজ্ঞানস্বল্পতা এবং গানের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণে অপারগতার কারণে। কিন্তু আমার সন্দেহ নাকচ হয় না যে অর্ণবের গানে প্রকাশভঙ্গিতে নতুনত্ব থাকতেও পারে, কিন্তু প্রকাশবস্তুতে না। সেক্ষেত্রে অর্ণবের অন্যরকম অন্যরকম হতে পারে, কিন্ত নতুন রকম হয়তো না শেষপর্যন্ত।

তবে তারপরও, সন্দেহসমেতই, অর্ণবের “অন্যরকম” হওয়ায় আমাদের উপকার বই অপকার হয় নাই। অর্ণবের গানের মধ্য দিয়ে আমরা একটা গানের পিছনে অনেকের কোলাবরেশন আরেকটু পরিষ্কার দেখতে পেলাম। একজনের গানের লিরিক অনেকজনে মিলে লেখা, বা অনেকে মিলে একটা গান গেয়ে ফেলা, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দিয়ে যাওয়া – যেসমস্তকিছু পূর্বেও ঘটছিল, খালি খেয়ালে আসে নাই – আমরা খেয়াল করলাম। অর্ণবের মাধ্যমে আমাদের এমন অনেক মিউজিশিয়ানদের সাথে পরিচয় হল যাঁরা ক্ষেত্রবিশেষে অর্ণবের চাইতেও ইন্ট্রিগিং (সাহানা বাজপেয়ী, যেমন)। আমরা গানে বেশকিছু মজার ট্রিটমেন্ট দেখলাম: আলগোছে লেখা লিরিক, চেনা-অচেনার মাঝামাঝি সুর, ইস্টার্ন-ওয়েস্টার্ন-নতুন-পুরান মিক্সআপ, নানান রকমের ইন্সট্রুমেন্ট, নতুন নতুন আওয়াজ – কী একটা হুইসেল, একটা চিৎকার, হারমনি বা অর্থহীন শব্দ বা মোবাইলের ভাইব্রেশন (“দিকবিদিক”), গানে গথিক আবহ (“বেবাক বিবাগী”, “তুই কি জানিস না ২”)। আমরা একাধিক জঁরায় অর্ণবের কারিগরি দেখলাম, ইন্ডি-পপ-রক-ফোক-ফিউশন-রবীন্দ্রসঙ্গীত… শেষ যেই গানটা শুনলাম সেইটা ইলেক্ট্রনিক ছিল। এবং আরও লাভ হল আমাদের। রবীন্দ্রসঙ্গীতের শ্রোতা বাড়ল, রবীন্দ্রবাদে অন্যসঙ্গীত (বা তাও না)এর শ্রোতাও বাড়ল। গানের মধ্যে অনেককিছু ইনকর্পোরেট করার স্কোপ আমরা দেখতে পেলাম। মোটমাট আমরা খুব এক্সাইটেড হয়ে উঠলাম, গান নিয়ে। “অন্যরকম”-এর নতুন-নতুন উপায় নিত্য বের করে যেতে হয় তাই-ই থেকে যাওয়ার জন্য, এবং, অর্ণব সেটা সফলভাবেই করলেন।

e0a685e0a6b0e0a78de0a6a3e0a6ac-2

অর্ণবের গানের শ্রোতা আসলে কারা? কারা অর্ণবের গানের সাথে রিলেট করতে পারে? অর্ণব নিয়ে যাদের মতামত আমি জানতে চেয়েছিলাম, তাদের বয়সে ভ্যারিয়েশন ছিল বটে, কিন্তু ক্লাসে? আমাদের অভিজ্ঞতা তো আমাদের অর্থনীতিই নির্ধারণ করে দেয়। আমার প্রায়ই মনে হত, অর্ণবের গানের শ্রোতা আমরা; মধ্যবিত্ত (উচ্চ? উচ্চ-মধ্য? নিম্ন-মধ্য?), মডার্নিস্ট (পোস্টমডার্ন তো আবার হয়ে সারি নাই আমরা এখনও… এবং আবারও, রবীন্দ্রনাথের ছায়া পড়ে যায়), যারা বাক্স থেকে বের হয় এই কথা জেনে যে বাইরেও আরেকটা বাক্স। আমাদের যাবতীয় মেট্রোপলিটান মেলান্‌কলি ধারণ করে, অর্ণবের গান, দু’-একটা ছাড়া (“তাঁতী”, “আকাশ কালো”), আমাদের জন্য। কিন্তু, আবার, জগতের সবার গান গাওয়ার তো বাধ্যবাধকতা নাই অর্ণবের। বা, তিনি যা গান, তার বিদ্যমানতা বা গুরুত্বও তো তিনি যা গান নাই তার জন্য খারিজ হয়ে যায় না। আর বলাই বাহুল্য তিনি যা গান তা তো আমরাও ধারণ করে থাকি – নৈমিত্তিক রোমান্টিসিজম – তা সে রাবীন্দ্রিক হোক বা অর্ণবীয়। অর্ণবের গানে বিপ্লবের কথা নাই, কিন্তু তাতে তো যাদবপুরে “হোক কলরব”-এর স্লোগান হতে কোনো সমস্যা হয় নাই। তাহলে একটার ভিতরেই আরেকটা থাকে, নিজস্ব সময়েই বাহির হয় কেবল। এবং যাবতীয় আপাত-বৈপরীত্যও, একটার সাথে একটা, বা একটার ভিতরে একটা, থাকে, অর্ণবের গানের মতোই, ফিউজ্‌ড়্‌। আমরা কখন কোনটা খুঁজছি তার উপর। আর কোনোটা খোঁজাতেই সমস্যা নাই, যতক্ষণ একটা আরেকটাকে নাকচ না করে দিতে চায়।

 

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

পাবলিশ্‌ড্‌ অ্যাট লাল জীপের ডায়েরী

ওয়ান্স: স্ট্রিট সং অথবা আরবান মিজ-অঁ-সিনের গীতমালা

[ সিনেমা নিজেই যেমন একটা পাঠকৃতি বা টেক্সট; তেমনি এর থাকে ইনার ও আউটার টেক্সট বা এক কথায় বিবিধ সাব-টেক্সট। অর্থাৎ, কোন জমিনের উপর সিনেমার গল্প হামাগুড়ি দিয়ে দাঁড়াইতেছে প্লাস সেই দাঁড়ানো সত্ত্বা দর্শকের লগে কি আলাপ জুইড়া বসতেছে- সেইটাও একটা আমল করার বিষয়। এদিকে, সিনেমার ভিতরেই আবার থাকে নানান বিষয়বস্তুর ইন্ট্রা-টেক্সচুয়াল রিলেশন… যেমন- স্ক্রিপ্ট, পারফর্মার, সম্পাদনা, আর্ট ডিরেকশন, ক্যামেরার চলন, সঙ্গীত ইত্যাদি। তো, এতসব ইত্যাদির মধ্যে একটা বিষয় সিনেমার মধ্যে থাইকাও ইমেজময় হাজির থাকে নিজস্ব যোশে। সেইটা হইলো মিউজিক বা সিনেমায় ব্যবহৃত সঙ্গীতমালা বা আবহসুরের কথন। আমরা দেখেই থাকবো, (মিউজিক্যাল) ফিল্মের মিউজিক এমন একটা বিষয় যেইটা উপভোগের তরে সর্বদা সিনেমার গল্প জানতে হয় না; সিনেমার মূল আখ্যানের মার্জিনের ভিতরে বা বাইরে অবস্থান করে এইটা হয়ে উঠতে পারে নিজেই একটা পুরাণ। তথাপি, আমরা জানবো যে… বঙ্গদেশে পপুলার কালচারাল জার্নালিজম বা ক্রিটিক্যাল অধিবিচারের পরিকাঠামোতে সিনেমার সুরযোজনার বিষয়টি খুব একটা আলাপের কাপে জায়গা না পাইতে। তো, এহেন সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ভিতর মাথা গুঁজ কইরা থাইকা লালজীপের ডায়েরী সচেষ্টা করে, আপাত মন্দনশীল বোধিচর্চার থিয়েটারে অন্যতর আলাপের পরিসর অংকন করতে। সেই আকাঙ্ক্ষা থেইকা একটা সিনেমার গল্প না বলে বরং অই সিনেমার অন্যতম অ্যাপার্টাসের স্পিরিটের ধ্রুবতারারে ফলো কইরা একটা মিথোজীবীমূলক বয়ান হাজির করার কোশেশ করা হইলো আনিকা শাহের সদালাপী ভাষ্যের মধ্যে দিয়ে। আপনার যাত্রা ফূর্তির হোক! ] …ভূমিকাঃ ইমরান ফিরদাউস

once

সাইড-এ

ওয়ান্স শুরু যখন হয়, দেখা যায় এক ছেলে ডাবলিনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে গিটার বাজিয়ে গান গাচ্ছে। ভ্যান মরিসনের গান কভার করছে – অ্যান্ড দ্য হিলিং হ্যাজ বিগান। গিটারের ব্যাগটা সামনে রাখা, তাতে পথচারীদের দেয়া পয়সা। এক লোক এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শোনে, ছেলেটার প্রশংসা করে, তারপর জুতার ফিতা বাঁধার ছলে গিটারের ব্যাগটা নিয়ে দৌড় দেয়। ছেলেটাও পিছে পিছে যায়। খুব বেশিদূর যেতে হয় না, ছেলেটা শেষপর্যন্ত তার পয়সা ফেরত পায়, লোকটা অনেকটা আপোসেই দিয়ে দেয়। ছেলেটাও আর খুব একটা কথা বাড়ায় না। দু’জনেই বুঝতে পারে, তাদের মধ্যে পার্থক্য আসলে খুব বেশি নাই।

ওয়ান্স মিউজিকাল মুভি। ২০০৭ সালের। ডিরেক্টর জন কার্নি, মূল দুই চরিত্রে গ্লেন হ্যান্সার্ড আর মার্কেটা ইর্গ্লোভা। আমার ওয়ান্স-এর গান নিয়ে লেখার কথা, মুভি নিয়ে না। কিন্তু এই গানগুলার নিজস্ব একটা কনটেক্সট আছে, একটা ভিজ্যুয়াল আছে; সেগুলা নাকচ করে দেয়া সম্ভব না, সমীচীনও না বোধহয়। তাছাড়া, যতই পর্দার রিয়্যালিটিতে ঘটা ঘটনা হোক, পর্দার বাইরের রিয়্যালিটিতেও তো এমনটা ঘটে। সবকিছুই ঘটে।

ওয়ান্স-এ ছেলেটা বাস্কার, রাস্তায় গিটার বাজিয়ে গান গায়, তাতে যে যা পয়সা দেয়। স্ট্রিট পারফর্ম্যান্সের আরেক নাম বাস্কিং – পাবলিক প্লেসে পারফর্ম করা, দর্শক-শ্রোতাদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বিনিময়ে। উইকিপিডিয়া বলে বাস্কিংয়ের চল মধ্যযুগ থেকে। রোমানি জিপসিরা ঘুরতে ঘুরতে স্পেন হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বাস্কিং শব্দটা ইংল্যান্ড আর ইউরোপের বাকি অংশে নিয়ে আসে। ১৯৬০’র হিপ্পি কালচারের সাথেও বাস্কিং সম্পৃক্ত। বাস্কিং এখন বিভিন্ন দেশে প্রচলিত, বিভিন্ন নামে। বাস্কিংয়ে পারফর্ম্যান্সও বিভিন্ন ধরনের হয় – মিউজিক, অ্যাক্রোব্যাটিক্‌স্‌, স্কেচিং বা পেইন্টিং, ম্যাজিক ট্রিক কিংবা স্ট্রিট থিয়েটার। ২০০০ থেকে সাইবার বাস্কিংয়েরও প্রচলন শুরু হয়েছে, আর্টিস্টরা তাদের কাজ আপলোড করে দেয়, কারো ভালো লাগলে তারা পেপ্যালে কিছু ডোনেশন দেয়। পপুলার কালচারেও বাস্কিং বহুল ব্যবহৃত, আগেও ছিল, ইদানীং হয়তো গুরুত্বটা অন্যরকম, অন্তত ওয়ান্স-এ তো বটেই।

সাইড-বি

তো… ওয়ান্স-এ ছেলেটা বাস্কার। দিনের বেলা সে চেনাজানা গান কভার করে, রাত বাড়লে পর নিজের গান গায়। এরকম এক রাতে মেয়েটার সাথে তার দেখা হয় – সে ম্যাগাজিন বিক্রি করছিল, গান শুনে দাঁড়ায়, জিজ্ঞেস করে গানটা তার নিজের লেখা কিনা। ছেলেটার বাবার দোকান আছে, হুভার (ভ্যাক্যুম ক্লিনার) রিপেয়ার করার, ছেলেটাও কাজ করে সেখানে। মেয়েটার একটা নষ্ট হুভার থাকে। পরদিন তাদের আবার দেখা হয়, নষ্ট হুভার-সমেত (কজমিক কানেকশান কখনও কখনও ভ্যাক্যুম ক্লিনারের রূপেও আসে)। মেয়েটাও মিউজিশিয়ান, একটা মিউজিক স্টোরে সে পিয়ানো বাজায়, মালিকের অনুমতিসাপেক্ষে। তারা সেই স্টোরে যায়, মেয়েটা পিয়ানো বাজায়, ছেলেটা গিটার বাজায়, গান গায়, স্টোরের মালিকের সাথে সাথে আমরাও ফলিং স্লোলি শুনি।

once-movie-of-the-week

তোমার-আমার এই যে দেয়াল…

একজন মিউজিশিয়ানের সংকটগুলা আসলে কী কী? ডাবলিনের রাস্তায় দিনের বেলা ছেলেটা নিজের গান গায় না, অচেনা গানে পয়সা বেশি আসে না বলে। ‘তো, তুমি পয়সার জন্যই করো খালি?’ – এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সে থমকে যায় একটু, সে আদৌ হয়তো উত্তরটা জানে না, বা ভাবে নাই কখনও। কিন্তু ভেবে দেখলে, তার সামনে প্ল্যাটফর্ম বলতে আসলে কী আছে? মেয়েটা চেক রিপাবলিক থেকে আয়ারল্যান্ডে এসেছে, সাথে তার মা আর মেয়ে। সে কখনও ফুল, ম্যাগাজিন বিক্রি করে, কখনও মানুষের ঘরদোর পরিষ্কার করে। সে গান লেখে, সুর করে, পিয়ানো বাজায়, কিন্তু নিজের একটা পিয়ানো কেনার সামর্থ্য তার নাই। ছেলেটা নিজের গানের ডেমো রেকর্ড করে লন্ডনে যেতে চায়, কিন্তু পয়সা আসবে কোত্থেকে? বাস্কিং করে? হুভার রিপেয়ার করে? ওদের গান রাস্তাঘাট আর মিউজিক স্টোর থেকে স্টুডিওতে ঠিক কীভাবে পৌঁছাবে?

ওয়ান্স-এ আমরা ছেলেটা আর মেয়েটাকে কোলাবরেট করতে দেখি। আমরা একটা একটা করে গান শুনতে পাই। ওয়ান্স-এর গানগুলার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ বোধহয় লিরিক। সিম্পল অ্যান্ড কোজি – আমরা ঘরের বর্ণনা দিতে গেলে বলি এমন, তবে অনেকটা ওইরকম, এবং তারচেয়েও বেশি। আর্টিস্টদের ব্যক্তিগত টানাপোড়েন, একধরনের স্টোরিটেলিং – আমরা রিলেট করতে পারি, আমাদের নিজস্ব স্মৃতি গানের সাথে যুক্ত হতে থাকে, আমাদের নিজস্ব স্টোরির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হয়ে যায়। আমরা মুভির কনটেক্সটের সাথেও নিজেদের মিলাতে পারি। যা কিছু চাই আর যা কিছু পাওয়া সম্ভব, তার কনফ্লিক্ট তো আমাদের কাছেও নতুন না। একদিকে ব্যক্তিগত টানাপোড়েন, আরেকদিকে আর্থ-সামাজিক সংকট, এরমধ্যে প্রায়োরিটিটা কীভাবে ঠিক রাখা যায়? সিদ্ধান্তটা আমরা কীভাবে নিব? আমরা সামনে আগাতে চাই ঠিক আছে, কিন্তু সেজন্য যেটুকু ধাক্কা পিছন থেকে প্রয়োজন, সেটা কে দিবে? মাঝে মাঝে তো সেটুকুই সবচাইতে প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। ওয়ান্স-এর ছেলেটা আর মেয়েটা সেই দিক দিয়ে ভাগ্যবান – দুইজন মিউজিশিয়ান একে-অপরকে সাহায্য করছে, কোলাবরেট করছে, ছোটখাটো ব্যাপার না সেইটা। নাহলে, যেখানে দেখে মনে হচ্ছে যে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড চাচ্ছে একটা ঘটনা ঘটুক, কিন্তু ম্যাটেরিয়াল পৃথিবী বাগড়া দিচ্ছে, সেখানে এই প্যাটার্ন থেকে বের হওয়া যায় কী করে?

আশা-প্রত্যাশা-নিরাশার ত্রিকোণমিতি

ওয়ান্স-এর ছেলেটা আর মেয়েটা গ্লেন হ্যান্সার্ড আর মার্কেটা ইর্গ্লোভা। দুইজনই মিউজিশিয়ান, একসাথে পারফর্মও করত দ্য সোয়েল সিজন নামে। ডিরেক্টর জন কার্নি একসময় হ্যান্সার্ডের ব্যান্ড দ্য ফ্রেইম্‌স্‌-এর বেইজিস্ট ছিল। এবং হ্যান্সার্ড একটা সময় আসলেই বাস্কিং করত, বাস্কিং নিয়ে মুভির কিছু কাহিনিও হ্যান্সার্ডের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। ওয়ান্স-এর গানগুলা হ্যান্সার্ড আর ইর্গ্লোভার কম্পোজ আর পারফর্ম করা, একটা গানের পারফর্মার ট্রান্সফেরেন্স নামে একটা ব্যান্ড। ওয়ান্স-এ আমরা ২০০৭ সালের ডাবলিন দেখি, ওয়ান্স-এর গান-সূত্রে আমাদের আয়ারল্যান্ডের কন্টেম্পোর‌্যারি মিউজিক নিয়ে একটা বোঝাপড়া হয়। আমরা বাস্কিং নিয়ে ভাবি, গান কীভাবে রাস্তাঘাট থেকে স্টুডিওতে যায় সেইটা দেখি। আমরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া দেখি, বদলাতে-থাকা অর্থনৈতিক অবস্থায় ঠিকঠাকমতন বেঁচেবর্তে থাকার চেষ্টা দেখি, ইচ্ছা আর সামর্থ্যের গরমিল দেখি, অতীত-ভবিষ্যতের মাঝামাঝি বর্তমানে দাঁড়িয়ে ‘একবার কী হল…’ সেইটা দেখি। আমরা আমাদের দেখি। ছেলেটা আর মেয়েটার তো কোনো নাম ছিল না। ছেলেটা আর মেয়েটা তো আমরাও হতে পারি, বা হইও।

আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গিটার বাজিয়ে গান হয়তো গাই না, কিন্তু গান আমাদের মাথায় বাজে। আমাদের জীবন নির্বিবাদ যাপিত হতে থাকে বা থাকে না, আমরা একবারের অপেক্ষায় থাকি। আমরা “বিগ ব্রেইক”-এর চিন্তা করি। আমরা সংকেত খুঁজি, আমরা কজমিক কানেকশন নিয়ে ভাবি। আমরা মনস্থির করি সামনে আগাতে, আমরা ইতস্তত করি পিছনের ভাঙা মেরামত হয় নাই বলে। আমরা রাতদুপুর করে অফিস থেকে বাসায় ফিরে সকালে উঠে লেখার কথা ভাবি। আমাদের দিন খারাপ যায়, কিন্তু আমরা রাস্তায় অচেনা লোকেদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলি। আমরা ধরে রাখি, ছেড়ে দেই। আমরা স্রোতে ভেসে যেতে যেতে ভাবি কোথায় গিয়ে পৌঁছাব। আমরা অনেকদিনের ব্যবহারে ফাটল-ধরা গিটার বদলাই না। আমরা অনেক বেঠিকের মাঝে একটা কিছু ঠিক হওয়ার অপেক্ষা করি। একবার।

once

গান তুমি হও বিশ্রী গরম ভুলিয়ে দেয়া বৃষ্টি

গান তো একই সাথে সামষ্টিক, ব্যক্তিগতও। সামষ্টিক-ব্যক্তিগত বলতে কি কিছু আছে? হিউম্যন নেইচার-মতন? যেমন, একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমাদের সবার ঠিক একই রকম অনুভূতি হবে? ভঙ্গি আলাদা হবে নিশ্চয়ই, প্রকাশ আলাদা হবে, কিন্তু মূল বিষয়টা, এসেন্সটা একই? ওয়ান্স-এর গান শুনলে আমার ওইরকম মনে হয়। নাহলে, আয়ারল্যান্ডের দুইজন স্ট্রাগ্‌লিং আর্টিস্টের কাহিনিতে আমাদের আসবে-যাবে কেন? শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা তাহলে গান লেখা বা গান রেকর্ড করা নিয়ে না; গানের মধ্য দিয়ে একটা গল্প, একটা ছবি দেখিয়ে দেয়া নিয়ে। গানের মধ্য দিয়ে যোগাযোগ করা নিয়ে। এজন্যই হয়তো আসে-যায়, আর গানগুলা শুনলে মনে হয় ঠিক সময়ে এরকম ঠিক-ঠিক গানগুলা ওরা ক্যামনে গেয়ে ফেলল।

১৯ জুলাই ২০১৪

 

*ওয়ান্স-এর সাউন্ডট্র্যাক- Once OST

*বাস্কিং বিষয়ে আরও- Street Performance

**কৃতজ্ঞতা- ইমরান ফিরদাউস; ফর দ্য টাইটেল(স্‌), অ্যান্ড মোর

 

পাবলিশ্‌ড্‌ অ্যাট লাল জীপের ডায়েরী